কুলেখাড়া পাতার উপকারিতা ও অপকারিতা

কুলেখাড়া পাতার উপকারিতা ও অপকারিতা সম্পর্কে আপনার হয়তো অনেকেই জানেনা। আজকের আর্টিকেলে আমি আপনাদের কুলেখাড়া পাতার পুষ্টিগুণ, ব্যবহার ও কুলেখাড়া পাতা খাওয়ার নিয়ম সম্পর্কে জানাবো। কুলেখাড়ার পাতা, কান্ড, ফুল, ফল ও শিকড় নানাবিধ রোগ প্রতিরোধের ক্ষমতায় ভরপুর একটি উদ্ভিদ।
কুলেখাড়া-পাতার-উপকারিতা-ও-অপকারিতা
কুলেখাড়া পাতা আমাদের শরীরে বিভিন্নভাবে বিভিন্ন রকমের উপকার করে থাকে। এর প্রধান উপকারিতা হলো কুলেখাড়া পাতার রস শরীরে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা, লোহিত রক্ত কণিকার পরিমাণ বৃদ্ধি করে। সুতরাং কুলেখাড়া পাতা সম্পর্কিত যাবতীয় তথ্য জানতে হলে আজকের আর্টিকেলটি মনোযোগ দিয়ে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পড়ে নিন।

পেইজ সুচিপত্রঃ কুলেখাড়া পাতার উপকারিতা ও অপকারিতা

কুলেখাড়া পাতার উপকারিতা

কুলেখাড়া পাতার উপকারিতা ব্যাপক যার গুণের কথা বলে শেষ করা যাবে না। কুলেখাড়ায় প্রদাহ প্রতিরোধকারী বৈশিষ্ট্য রয়েছে এবং এটি খেলে হজমশক্তিও উন্নত হয়। কুলেখাড়া খেলে পাকস্থলী এবং লিভারের কার্যকারিতা উন্নত হয়, শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেড়ে উঠে। ডায়রিয়া ও আমাশা চিকিৎসার জন্য কুলেখাড়া কার্যকরী। কুলেখাড়ায় অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল এবং অ্যানথেলমিন্টিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে। কুলেখাড়া ব্যথা নাশক হিসেবেও কার্যকরী।

পুরুষ বন্ধ্যাত্বের চিকিৎসায়ঃ কুলেখাড়া গাছের বীজ পুরুষদের বন্ধ্যাত্বের চিকিৎসায় ব্যবহার করা হয়। এর বীজ একটি অ্যাফ্রোডিসিয়াক হিসাবে কাজ করে। এটি সিরাম টেস্টোস্টেরন এবং শুক্রাণুর সংখ্যা বৃদ্ধি করতে পারে। কুলেখাড়া পাতার উপকারিতা অনেক এক্ষেত্রে।

রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসঃ রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস একটি দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহজনক রোগ যা বিশ্বব্যাপী পুরুষদের তুলনায় মধ্যবয়সী মহিলাদের বেশি প্রভাবিত করে। কুলেখাড়া পাতা এর প্রদাহ-বিরোধী বৈশিষ্ট্যের কারণে RA-এর লক্ষণগুলিকে উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করতে দেখা যায়। এটি উল্লেখযোগ্যভাবে এরিথ্রোসাইট সেডিমেন্টেশন রেট (ESR) হ্রাস করে এবং হিমোগ্লোবিনের উপাদান উন্নত করে।

অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল এজেন্ট হিসাবে কাজ করেঃ আমাদের শরীরের চারপাশে হাজার হাজার ব্যাকটেরিয়া আছে। আপনি এটি দেখতেও পাচ্ছেন না, কিন্তু কোটি কোটি ব্যাকটেরিয়া আপনার ত্বকে বাসা বানিয়েছে। আর এই ব্যাকটেরিয়া খুবই সুবিধাবাদী। একবার জায়গা পেলেই তারা রোগ ছড়াতে শুরু হয়ে যায়। তাই তাদের প্রতিহত করতে কোনো ভুল করা উচিত নয়।

আর এই কাজেও সাহায্য করতে পারে কুলেখাড়ার পাতা। কারণ, এতে অ্যান্টি-ব্যাকটেরিয়াল গুণ রয়েছে। এ কারণে কুলেখাড়ার পাতা খেলে সহজেই ব্যাকটেরিয়া দূর হয়এর পাতা ও শিকড়ের নির্যাস এশেরিচিয়া কোলি, ক্লেবসিয়েলা নিউমোনিয়া, সিউডোমোনাস এরুগিনোসা, স্ট্যাফিলোকক্কাস এপিডার্মিডিস, ব্যাসিলাস সেরিয়াস এবং ব্যাসিলাস সাবটিলিসের বিরুদ্ধে উল্লেখযোগ্য জীবাণুনাশক বৈশিষ্ট্য দেখায়।

ডায়াবেটিস পরিচালনার জন্য এর উপকারিতাঃ ডায়াবেটিস মেলিটাস রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বাড়িয়ে দেয় যা অক্সিজেন-মুক্ত র‍্যাডিকেলের সংখ্যা বৃদ্ধি করে। এই অক্সিজেন-মুক্ত র‍্যাডিকেলগুলি ডায়াবেটিস রোগীদের বিভিন্ন জটিলতার জন্য দায়ী। কুলেখাড়ার নির্যাস উল্লেখযোগ্য অ্যান্টি-ডায়াবেটিক বৈশিষ্ট্যের অধিকারী যা এই র‍্যাডিকেলগুলির প্রভাবকে বিপরীত করতে পারে। এই ক্রিয়াকলাপটি মূলত এর অ্যান্টি-অক্সিডেটিভ সম্পত্তির কারণে যা মুক্ত র‍্যাডিকেলগুলিকে ধ্বংস করতে সহায়ক।

অ্যানিমিয়া বা রক্তাল্পতা প্রতিরোধ করেঃ কুলেখাড়া গাছের পাতা ও কাণ্ড অ্যানিমিয়া প্রতিরোধ করে। এই গাছের পাতা ও কাণ্ড খেলে বা সেটার রস পান করলে রক্তে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা বৃদ্ধি পায়। এই বিষয়টি আয়ুর্বেদে উল্লেখ করা থাকলেও আধুনিক জুগেও এটি বহু রোগীর উপর গবেষণা করে দেখা হয়েছে। যারা অ্যানিমিয়া বা রকাল্পতায় ভোগেন দেখা গেছে তাঁরা কুলেখাড়া পাতা খেলে তাঁদের শরীরে হিমোগ্লোবিন ও হোয়াট ব্লাড সেল দুটোই বৃদ্ধি পাচ্ছে।

রক্তে হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ কমে গেলে কুলেখাড়া পাতার রস সেদ্ধ করে, ছেঁকে নিয়ে সেই জল খান। এক সপ্তাহের মধ্যে হিমোগ্লোবিনের সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে। অথবা দিনে ২ বার ৪ চা চামচ কুলেখাড়া পাতার রস সামান্য গরম করে খান।

রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসঃ রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস একটি দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহজনক রোগ যা বিশ্বব্যাপী পুরুষদের তুলনায় মধ্যবয়সী মহিলাদের বেশি প্রভাবিত করে। কুলেখাড়া পাতা এর প্রদাহ-বিরোধী বৈশিষ্ট্যের কারণে RA-এর লক্ষণগুলিকে উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করতে দেখা যায়। এটি উল্লেখযোগ্যভাবে এরিথ্রোসাইট সেডিমেন্টেশন রেট (ESR) হ্রাস করে এবং হিমোগ্লোবিনের উপাদান উন্নত করে।

ব্লিডিং আলসার দূর করেঃ কিছু ধরনের আলসার থাকে, যার ক্ষত বা ঘা এতটাই খারাপ পর্যায়ে পৌঁছে যায় যে সেখান থেকে রক্ত বেরোতে শুরু করে। অনেক সময় এই রক্ত ক্ষরণ শরীরের ভিতরে হয় বলে আমরা বুঝতেও পারিনা কিন্তু অজান্তেই শরীরের অনেক ক্ষতি হয়ে যায়। কুলেখাড়া এই রক্তক্ষরণ বন্ধ করে দিতে সক্ষম। তাছাড়া রক্ত বেরনোর জন্য আপনার যেটুকু ব্লাড লস হয়েছে সেটাও পূরণ করে দেয় এই পাতা।

লিভার বা পাকস্থলীর সুরক্ষা দেয়ঃ শুধু শরীরে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা বাড়িয়ে দেয় না এই পাতা। আপনার লিভারের সুরক্ষাও প্রদান করে। বিশেষ করে খাওয়ার হজম করাতে কুলেখাড়া পাতা কাজে দেয় কারণ এতে আছে বেশ কিছু পাচক বা এনজাইম। এছাড়াও লিভার বা পাকস্থলী যাতে নিজের কাজ ঠিকঠাক করতে পারে সেটাও লক্ষ্য রাখে এই পাতা।

কিডনির পাথর গলিয়ে দেয়ঃ যারা কুলেখাড়া পাতা সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানেন না, তাঁদের বলি, রক্তে হিমোগ্লোবিনের পরেই যদি আর কোনও কারনে এই পাতার ব্যবহার সর্বাধিক হয়ে থাকে তাহলে সেটা হল কিডনির স্টোন বা পাথর দূর করতে।এই উদ্ভিদে যে এনজাইম আছে তা কিডনির ভিতরে জমে থাকা স্টোন বা পাথর ভেঙে প্রথমে ছোট করে দেয়। তারপর সেটা ধীরে ধীরে গলিয়ে দিতে শুরু করে। এটা শরীর থেকে মল বা মূত্র রূপে বেরিয়ে আসে।

শরীরের কোষে পুষ্টি যোগায়ঃ কোষের সঠিক বিকাশ ও বৃদ্ধির জন্য যা প্রয়োজন তা আছে কুলেখাড়া পাতায়। এর মধ্যে আছে প্রয়োজনীয় মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট। এর মধ্যে আছে আরও অনেক ক্ষারীয় উপাদান। এছাড়া আছে এমন কিছু খনিজ নুন যা কোষের বিকাশের জন্য দরকার। তাই এই পাতা মাঝে মাঝে বা নিয়মিত খেলে শরীরের কোষে সঠিক পুষ্টি সরবরাহ হয়।

শারীরিক শক্তি বৃদ্ধি করেঃ শরীরের প্রতিটি কোষ যখন পুষ্টি পায় তখন এটা খুবই স্বাভাবিক যে আমাদের শারীরিক শক্তিও তার সঙ্গে বৃদ্ধি পায়। কুলেখাড়া ঠিক সেই কাজটি খুব যত্নের সঙ্গে করে। রক্তে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা বৃদ্ধি করার সঙ্গে সঙ্গে এটি রক্ত পরিশ্রুতও করে। সব মিলিয়ে দেখা গেছে যে এটি নিয়মিত খেলে বা এর রস পান করলে আমাদের এনার্জি অনেকটাই বেড়ে যায়।

জননতন্ত্র গঠনে সাহায্য করেঃ যেসব মহিলারা সদ্য মা হয়েছেন তাঁদের জন্য এবং আমাদের জননতন্ত্র ও যৌনাঙ্গকে মজবুত ও আরও উন্নত করে এই পাতা। অনেকে বিশ্বাস করেন এই পাতা ও তার কাণ্ড ফুটিয়ে সেদ্ধ করে সেই জল পান করলে মাতৃত্বকালীন যে অতিরিক্ত ঋতুস্রাবের সমস্যা হয় সেটা কমে যায়। আসলে এই পাতার মধ্যে সেই গুণ আছে যা রক্তক্ষরণ রোধ করতে সক্ষম।

ব্যাথা সারাতেঃ ভেষজটিতে হলুদের মতো অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল এবং অ্যানথেলমিন্টিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে। কুলেখাড়া ব্যথা উপশমে ব্যথানাশক হিসেবেও কাজ করে।

ক্ষত সারাতেঃ হাত-পা ছড়ে গিয়ে রক্ত বেরলে কুলেখাড়া পাতা ঘঁষে ক্ষতস্থানে চেপে ধরুন। এতেই রক্ত পড়া বন্ধ হয়ে যাবে। এমনকী ক্ষত সেরে যাবে চটজলদি।

অনিদ্রার সমস্যাঃ অনিদ্রা দূর করতেও সিদ্ধহস্ত কুলেখাড়ার রস। তাই প্রতিদিন সন্ধ্যায় খান এই রস। তাতেই ভালো ঘুম হবে রাতে। দূরে পালাবে অনিদ্রার ব্যারাম।

হজম শক্তি বাড়বেঃ কুলেখাড়া পাতার রস পাচনতন্ত্রকে ভালো রাখার পাশাপাশি হজমক্ষমতা বাড়াতে এবং কোষ্ঠাকাঠিণ্য দূর করতেও বিশেষ ভূমিকা নেয়।

কুলেখাড়া পাতার পুষ্টিগুণ

কুলেখাড়া পাতা এটি বহুমুখী ওষুধি উদ্ভিদ যা প্রচুর পুষ্টিগুনে ভরপুর। এর পুষ্টিগুণ ও ঔষধি গুণাবলী একে প্রাকৃতিক ঔষধ হিসেবে বিভিন্ন সমস্যার সমাধান কার্যকর করে তোলে। কুলেখাড়া পাতায় ভিটামিন-এ, ভাল পরিমান আয়রন, উত্‍সেচক, স্টেরল থাকে। কুলেখাড়া মূত্র বৃদ্ধি করে দেহের শোথ বা ফোলা কমায়। নিচে কুলেখাড়া পাতার প্রধান পুষ্টিগুণ গুলো আলোচনা করা হয়েছেঃ

১। ভিটামিনঃ কুলেখাড়া পাতায় প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন এ, ভিটামিন সি এবং ভিটামিন ই রয়েছে। ভিটামিন এ চোখের স্বাস্থ্য রক্ষা করে, ভিটামিন সি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে এবং ভিটামিন ই একটি শক্তিশালী এন্ড অক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে।

২। মিনারেলঃ মিনারেল এর মধ্যে কুলেখাড়া পাতায় ক্যালসিয়াম, আয়রন, পটাশিয়াম এবং ম্যাগনেসিয়াম পাওয়া যায়। ক্যালসিয়াম হাড় ও দাঁতের গঠনের সহায়ক, আয়রন রক্তের হিমোগ্লোবিন উৎপাদনের সাহায্য করে, পটাশিয়াম রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে এবং ম্যাগনেসিয়াম শরীরের বিভিন্ন বায়োকেমিক্যাল প্রতিক্রিয়ার সহায়তা করে।

৩। অ্যান্টিঅক্সিডেন্টঃ কুলেখাড়া পাতায় প্রচুর এনটিঅক্সিডেন্ট রয়েছে, যা শরীরের ফ্রি রেডিক্যালের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে রক্ষা করে এবং ক্যান্সার সহ বিভিন্ন দীর্ঘস্থায়ী রোগের ঝুঁকি কমায়। এরমধ্যে প্রধান অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হল ফ্ল্যাভোনয়েড, ফেনোলিক যৌগ এবং ট্যানিন ।

৪। প্রোটিন ও অ্যামিনো এসিডঃ কুলেখাড়া পাতায় প্রোটিনের পরিমাণও উল্লেখযোগ্য। এতে উপস্থিত প্রোটিন শরীরের কোষ গঠন ও মেরামতের সাহায্য করে। এছাড়াও প্রয়োজনীয় অ্যামিনো এসিড গুলি শরীরের বিভিন্ন কার্যক্রম সঠিকভাবে সম্পাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

৫। ডায়েটারি ফাইবারঃ কুলেখাড়া পাতায় প্রচুর ফাইবার রয়েছে যা হজম প্রক্রিয়াকে উন্নত করে এবং কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে। ফাইবার রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণের সহায়ক এবং কোলেস্টেরল কমাতে কার্যকর।

৬। অ্যান্টি-ইনফ্লামেটরি ও অ্যান্টি-ব্যাকটেরিয়াল গুণাবলীঃ কুলেখাড়া পাতায় উপস্থিত ফ্ল্যাভোনয়েড ও ট্যানিন উপাদান গুলি অ্যান্টি ইনফ্লেমেটরি গুণাবলী রয়েছে যা প্রদাহ কমাতে সহায়ক। এছাড়াও এর অ্যান্টি ব্যাকটেরিয়াল গুণাবলী শরীরকে বিভিন্ন ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণ থেকে রক্ষা করে।

কুলেখাড়া পাতার পুষ্টিগুণ তুলে ধরা হলোঃ

পুষ্টি উপাদান পরিমান
শক্তি ৩৪ ক্যালরি
সোডিয়াম ৫৬.১ মিঃগ্রা
পটাশিয়াম ২৬৬
ক্যালসিয়াম ২৭.৯৩
আয়রন ৯.০৩
ভিটামিন-সি ৫০.০৮
ভিটামিন-এ ৬০০-১০০০ আইইউ
বিটা ক্যারোটিন ২.৫
ফোলিক এসিড ১.০
শর্করা ০.৭-০.৯ গ্রাম
ফ্যাট ০.৫-০.৭
ফাইবার ২.৫-৩.৫

কুলেখাড়া পাতার ব্যবহার 

আয়ুর্বেদে কুলেখাড়ার বীজ, শিকড় এবং পঞ্চাঙ্গ অর্থাৎ মূল, ফুল, কাণ্ড, ফল এবং পাতা একসাথে মিশিয়ে ওষুধ হিসাবে ব্যবহৃত হয়। কুলেখাড়ার পাতা শিকড় ও বীজ রাসায়নিক উপাদানে ভরপুর। এতে আছে অ্যালকালয়েড্‌স, ফাইটোস্টেরোল ও সুগন্ধি তৈল পদার্থ। এছাড়া রয়েছে উৎসেচক ডাইয়াসটেজ ও লিপেজ। এই পাতা আপনি নানা রূপে এবং নানা ভাবে ব্যবহার করতে পারেন।

এই গাছের কাণ্ড, পাতা, মূল ও বীজ সবটাই ব্যবহার করা যায়। যদি সরাসরি এই উদ্ভিদ আপনি গ্রহণ করতে চান তাহলে তিনটি উপায়ে করতে পারেন। কাঁচা পাতার স্যালাদ খেতে পারেন, এই পাতা ও কাণ্ডের রস খেতে পারেন বা শাক হিসাবে রান্না করে খেতে পারেন। যদি সরাসরি খেতে আপনার কোনও সমস্যা বা অসুবিধে হয় তাহলে আপনি কুলেখাড়ার টনিক, কুলেখাড়ার পাউডার, কুলেখাড়ার ট্যাবলেটও খেতে পারেন।

যাঁদের চোখে সমস্যা আছে বিশেষ করে কর্নিয়ার আলসারে যারা ভুগছেন তাঁরাও এই পাতা ব্যবহার করতে পারেন। তাঁরা এই গাছের পাতা আর কাণ্ড পুড়িয়ে তার থেকে যে ধোঁয়া বেরোয়, তার সামনে বসতে হয়। বিশ্বাস করা হয় যে এই কুলেখাড়া গাছের পাতা পুড়িয়ে যে ধোঁয়া বেরোয় সেটা চোখে গেলে এই কর্নিয়ার আলসার সেরে যায়।

কুলেখাড়া পাতা খাওয়ার নিয়ম

কুলেখাড়া পাতা খাওয়ার বিভিন্ন নিয়ম রয়েছে। কুলেখাড়া পাতার উপকারিতা পেতে এটি  খাওয়ার সঠিক নিয়ম জানা গুরুত্বপূর্ণ। কুলেখাড়া পাতার উপকারিতা পেতে সঠিক নিয়মে এবং সঠিক পরিমাণে ব্যবহার করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিন নির্দিষ্ট পরিমাণে কুলেখাড়া পাতা খেলে এর পুষ্টিগুণ এবং ঔষধি গুণাবলী থেকে সর্বাধিক উপকার পাওয়া সম্ভব। নিচে কুলেখাড়া পাতা খাওয়ার বিভিন্ন নিয়ম ও পরামর্শ দেওয়া হলোঃ

১. রস হিসেবে প্রস্তুতিঃ তাজা কুলেখাড়া পাতা সংগ্রহ করে ভালোভাবে ধুয়ে নিন। পাতাগুলো ব্লেন্ডারে ব্লেন্ড করে রস বের করুন। কুলেখাড়ার এই রস আপনার স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত উপকারী।

খাওয়ার নিয়মঃ প্রতিদিন সকালে খালি পেটে ২-৩ চামচ কুলেখাড়া পাতার রস পান করতে পারেন। এটি হজম প্রক্রিয়া এবং শরীরের ডিটক্সিফিকেশন সহায়ক।

২. পেস্ট হিসেবে প্রস্তুতিঃ তাজা কুলেখাড়া পাতা পিষে পেস্ট তৈরি করে নিতে পারেন।

খাওয়ার নিয়মঃ পেস্টি সরাসরি খাওয়া বা মধু বা অন্য কোন প্রাকৃতিক মিশ্রণের সাথে মিশে খেতে পারেন। এটি ত্বকের যত্নে বা অন্য উপকারিতা পেতে ব্যবহারকরতে পারেন।

৩. চা হিসেবে প্রস্তুতিঃ কিছু তাজা বা শুকনো কুলেখাড়া পাতা নিয়ে ফুটন্ত পানিতে ৫ থেকে ১০ মিনিট সেদ্ধ করুন।

খাওয়ার নিয়মঃ প্রতিদিন সকালে বা বিকালে এক কাপ কুলেখাড়া পাতার চা পান করতে পারেন। এটি প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং হজম শক্তি বাড়াতে সহায়ক।এর স্বাদ বাড়াতে এতে মধু মিশিয়ে পান করতে পারেন।

৪. কুলেখাড়া পাতার পাউডার প্রস্তুতিঃ কুলেখাড়া পাতা রোদে ভালো করে শুকিয়ে গুঁড়ো তৈরি করুন।

খাওয়ার নিয়মঃ প্রতিদিন সকালে খালি পেটে ১ থেকে ২ চামচ কুলেখাড়া পাতার পাউডার পানির সাথে মিশিয়ে পান করতে পারেন।

৫. কুলেখাড়া পাতার ক্যাপসুল প্রস্তুতিঃ বাজারে প্রস্তুত ক্যাপসুল পাওয়া যায়।

খাওয়ার নিয়মঃ চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী দিনে ১ থেকে ২ টি ক্যাপসুল গ্রহণ করতে পারেন।

৬. স্যুপে মিশিয়ে প্রস্তুতিঃ আপনার প্রিয় স্যুপে কিছু তাজা খুলে খেলে পাতা মিশিয়ে নিতে পারেন।

খাওয়ার নিয়মঃ স্যুপের সাথে নিয়মিত কুলেখাড়া পাতা মিশিয়ে খেতে পারেন।

৭. বিভিন্ন রান্নায় ব্যবহার প্রস্তুতিঃ সবজি বা সালাদে দিয়ে কুলেখাড়া পাতা মিশিয়ে খেতে পারেন।

খাওয়ার নিয়মঃ প্রতিদিনের খাবারে কুলেখাড়া পাতা মিশে খেতে পারেন।

৮. ডেকোশন বা ক্বাথপ্রস্তুতিঃ ১ কাপ পানিতে ৫-৬ টি কুলেখাড়া পাতা দিয়ে ১৫ মিনিট ফুটিয়ে নিন।

খাওয়ার নিয়মঃ দিনে দুইবার ক্বাথ পান করতে পারেন।

আরও যেসব নিয়মে খেতে পারেনঃ
  • সতেজ টাটকা কুলেখাড়া পাতা চিবিয়ে খেয়ে ফেলতে পারেন। তবে চিবিয়ে খাওয়ার আগে পাতা খুব ভালোভাবে ধুয়ে পরিষ্কার করে নেবেন যাতে এদের কোনো ধরনের পেস্টিসাইড না থাকে।
  • আবার আপনি বিভিন্ন সালাদের সাথেও এই পাতা কুচি করে মিশিয়েও খেতে পারেন। এতে সালাদের স্বাদও বৃদ্ধি পাবে।
  • অনেকেই কুলেখাড়া পাতা রান্না করে খান। কারণ কুলেখাড়া পাতা শাক হিসেবেও খাওয়া যায়। আপনি চাইলে কুলেখাড়া পাতা শাক হিসেবে ভাজি করেও খেতে পারেন।

কুলেখাড়া পাতার রস খেলে কি হয়

কুলেখাড়া পাতার রস খেলে হয় জানতে চেয়ে অনেকে প্রশ্ন করেছে।কুলেখাড়া পাতা এটি বহুমুখী ওষুধি উদ্ভিদ যা প্রচুর পুষ্টিগুনে ভরপুর। এর পুষ্টিগুণ ও ঔষধি গুণাবলী একে প্রাকৃতিক ঔষধ হিসেবে বিভিন্ন সমস্যার সমাধান কার্যকর করে তোলে। কিন্তু কুলেখাড়া পাতার রস খেলে কি হয় জানেন কি? কুলেখাড়া পাতার মতো কুলেখাড়া পাতার রসও প্রচুর পুষ্টিগুনে ভরপুর। এবার চলুন জেনে নিন কুলেখাড়া পাতার রস খেলে কি হয়ঃ
কুলেখাড়া-পাতার-রস-খেলে-কি-হয়
  • আপনি যদি প্রাকৃতিকভাবে আপনার পেটের মেদ ঝরিয়ে ফেলতে তাহলে কুলেখাড়া পাতার রস খেতে পারেন। কারণ এই পাতার রস পেটের চর্বি কমাতে বিশেষভাবে সাহায্য করে।
  • কুলেখাড়া পাতার রস খেলে এটি আপনার পাচনতন্ত্রের কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি করে এবং পেটে গ্যাস অম্বলের সমস্যা দূর করে।
  • নিয়মিত কুলেখাড়া পাতার রস খাওয়ার ফলে আপনার শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। কারণ, কুলেখাড়ার পাতায় রয়েছে প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট যা আপনার শরীরকে বিভিন্ন ধরনের রোগ বালাই থেক সুরক্ষা দেয়।
  • কুলেখাড়া পাতার রস খেলে এই পাতার রস আপনার শরীর থেকে বিভিন্ন ধরনের দূষিত পদার্থ ডিটোক্সিফাই করে। এতে করে আপনার লিভার ও কিডনির কার্যক্ষমতা বেড়ে যায় এবং শরীর ভেতর থেকে পরিষ্কার থাকে।
  • শুধু তাই নয় কুলেখাড়া পাতার রস আপনার ত্বকের জন্য উপকারী। নিয়মিত কুলেখাড়া পাতার রহস্যে বনে আপনার ত্বকের উজ্জ্বলতা বৃদ্ধি পায় এবং ত্বকের দাগ ছোপ কমতে থাকে।
  • কুলেখাড়া পাতার রসে যে ভিটামিন এবং খনিজ পদার্থ রয়েছে তা আপনার শরীরে অতিরিক্ত শক্তি সরবরাহ করে। যা আপনাকে দৈনন্দিন কাজ করবে অতিরিক্ত শক্তির যোগান দিতে পারে।

কুলেখাড়া পাতার রস সেবনের পরিমাণঃ কুলেখাড়া পাতার রস কখনোই অতিরিক্ত খাওয়া একেবারে উচিত নয়। একজন প্রাপ্তবয়স্ক সুস্থ স্বাভাবিক মানুষের জন্য প্রতিদিন ১-২ চা চামচ কুলেখাড়া পাতার গুঁড়ো খাওয়া স্বাস্থ্যসম্মত। আর আপনি যদি এর পাতার রস খেতে চান তাহলে ১ চা চামচ রসই আপনার স্বাস্থ্যের জন্য যথেষ্ট।

কুলেখাড়া পাতার রস কেন এবং কখন খাবেন

কুলেখাড়া পাতার রস প্রাকৃতিক ঔষধি গুণাবলীর জন্য বিশেষভাবে পরিচিত এবং এটি বিভিন্ন স্বাস্থ্য সমস্যার প্রতিকারে ব্যবহৃত হয়। কুলেখাড়া পাতার রস খাওয়ার মূল কারণ হলো এর বিভিন্ন পুষ্টিগুণ এবং ঔষধি গুণাবলী যা শরীরে সামগ্রিক স্বাস্থ্য উন্নত করতে সাহায্য করে। কুলেখাড়া পাতার রস আয়রনের একটি সমৃদ্ধ উৎস, যার রক্তস্বল্পতা প্রতিরোধে এবং হিমোগ্লোবিনের মাত্রা বাড়াতে কার্যকর।

এতে উপস্থিত এন্টিঅক্সিডেন্ট এবং অ্যান্টি ইনফ্লামেটরি গুণাবলী বিভিন্ন প্রদাহ জনিত সমস্যা দূর করতে সাহায্য করে। বিশেষ করে বাতের ব্যথা দূর করতে বেশি কার্যকর।এছাড়া কুলেখাড়া পাতার রস হজম শক্তি বৃদ্ধি করে। কিডনির কার্যকারিতা উন্নত করে এবং মুত্রনালী পরিষ্কার থাকতে সহায়ক। এটি রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে এবং ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হিসেবে কাজ করে।

কুলেখাড়া পাতার রস খাওয়ার সঠিক সময় হলেও সকালে খালি পেটে। এই সময়ে খেলে শরীর সহজে এবং দ্রুত এর পুষ্টিগুণ শোষণ করতে পারে। সকালে খালি পেটে কুলেখাড়া পাতা রস খেলে এটি হজম প্রক্রিয় উন্নত করে এবং শরীরকে সারাদিনের জন্য প্রস্তুত করে। এছাড়া কুলেখাড়া পাতা রস প্রতিদিন নিয়মিত খেলে রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে থাকে যা ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য বিশেষভাবে উপকারী।

গর্ভ অবস্থায় স্তন্যদান কালীন সময়ে ফুলে পাতার রস খাওয়ার আগে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া উচিত। কারণ এই সময়ে শরীরের হরমোনাল পরিবর্তনের কারণে অতিরিক্ত কোন প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহার স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। সুতরাং কুলেখাড়া পাতার রস প্রাকৃতিক পুষ্টি এবং ঔষধি গুণাবলীর জন্য অত্যন্ত উপকারী তবে এর সঠিক ব্যবহার ও খাওয়ার নিয়ম মেনে চলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

গর্ভাবস্থায় কুলেখাড়া পাতা খাওয়ার উপকারিতা

গর্ভাবস্থায় কুলেখাড়া পাতা খাওয়ার উপকারিতা ব্যপক আপনার জন্য উপকারী হতে পারে। কারণ গর্ভাবস্থায় কুলেখাড়া পাতার খুব একটা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই বললেই চলে। প্রেগনেন্সির সময় কুলেখাড়া পাতা খাওয়া নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন করে থাকে। গর্ভাবস্থায় কুলেখাড়া পাতা খাওয়া উপকারী কিনা, নিরাপদ কিনা , কিভাবে খাব তারই উত্তর জানাবো। তো চলুন গর্ভাবস্থায় কুলেখাড়া পাতার উপকারিতা সম্পর্কে জেনে নিন-
  • কুলেখাড়া পাতা ভিটামিন এ, ভিটামিন সি এবং ক্যালসিয়ামের একটি দুর্দান্ত উৎস যা একজন গর্ভবতী মা এবং তার গর্ভস্থ ভ্রূণের সঠিক বিকাশ ও বৃদ্ধির জন্য অত্যন্ত জরুরী।
  • গর্ভকালীন সময়ে কোষ্ঠকাঠিন্য একটি সাধারণ সমস্যা। কমবেশি সকলেই গর্ভাবস্থায় কোষ্ঠকাঠিন্যে ভুগতে থাকেন। কোষ্ঠকাঠিন্য থেকে মুক্তি পেতে আপনি খেতে পারেন কুলেখাড়া পাতা। কারণ কুলেখাড়া পাতা হজম ক্রিয়াকে অনেকটাই সহজ করে দেয়।
  • কুলেখাড়া পাতা আয়রনের একটি ভালো উৎস। এই আয়রন গর্ভাবস্থায় একজন গর্ভবতী মায়ের রক্তস্বল্পতার ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে। ফলে কুলেখাড়া পাতা খেলে আপনি অ্যানিমিয়া থেকেও রেহাই পেতে পারেন।
  • গর্ভাবস্থায় কুলেখাড়া পাতা খেলে এটি গর্ভবতী মায়ের ইমিউন সিস্টেম কে শক্তিশালী করে তোলে। ফলে, গর্ভস্থ শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষিত থাকে।
  • কুলেখাড়া পাতার কিছু আন্টি ইনফ্লামেটরি বৈশিষ্ট্য রয়েছে যা গর্ভাবস্থায় আপনার শরীরের বিভিন্ন ধরনের শারীরিক প্রদাহ কমাতে কাজ করে।গর্ভাবস্থায় কুলেখাড়া পাতা খাওয়ার ক্ষেত্রে সতর্কতা
  • গর্ভাবস্থায় অত্যন্ত সতর্কতার সাথে কুলেখাড়া পাতা খাওয়া উচিত। কেননা অতিরিক্ত মাত্রায় কুলেখাড়া পাতা খাওয়া আপনার গর্ভপাতের কারণ হতে পারে।
  • গর্ভাবস্থার প্রথম ট্রাইমেস্টারে কুলেখাড়া পাতা সেবন না করাটাই ভালো। কারণ, এই সময় গর্ভপাতের ঝুঁকি থাকে।
  • গর্ভাবস্থায় আপনি প্রতিদিন এক চা চামচ তুলে খাড়া পাতার গুঁড়ো বা কুলেখাড়া পাতা কুচি করে খেতে পারেন। তবে এর বেশি পরিমাণ অবশ্যই খাবেন না।

কুলেখাড়া পাতা সম্পর্কে সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্নোত্তর

আপনারা যারা কুলেখাড়া পাতা সম্পর্কিত সচোরাচর যে প্রশ্নগুলা গুগলে কিংবা কোনো ওয়েব সাইটে এসে সার্চ করে থাকেন তার সংক্ষেপে কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর নিচে তুলে ধরা হলো। যা কুলেখাড়া পাতা সম্পর্কে আশা করছি আপনারা সংক্ষিপ্ত কিছু ধারনা লাভ করতে পারবেনঃ

প্রশ্নঃ গর্ভবতী মহিলারা কি কুলেখাড়া পাতা ব্যবহার করতে পারে?

উত্তরঃ প্রথমে দেখতে হবে এটা আদৌ তাঁদের প্রয়োজন আছে কিনা। যদি গর্ভবতী অবস্থায় রক্তাল্পতার সমস্যা একজন হবু মায়ের থাকে তাহলে কুলেখাড়া পাতা সে খেতে পারে। যদি না তার ডাক্তারের কোনও বারণ থেকে থাকে। সরাসরি এই পাতা গ্রহণ করায় কোনও সমস্যা থাকলে কুলেখাড়া পাতার টনিক বা ট্যাবলেটও খাওয়া যায়। যেহেতু গর্ভবতী মায়ের সঙ্গে শিশুর ভবিষ্যৎ জড়িয়ে আছে তাই একবার ডাক্তারের সঙ্গে পরামর্শ করে নেওয়া উচিত।

প্রশ্নঃ  মাতৃদুগ্ধ মা কি কুলেখাড়া পাতা ব্যবহার করতে পারেন?

উত্তরঃ শিশুর জন্মের পর অনেক মাই রক্তাল্পতায় ভোগেন। কিনা।সন্তানের জন্মের পর মহিলাদের আবার ঋতুস্রাব শুরু হয়ে যায়। আর নয় মাস ঋতুস্রাব বন্ধ থাকার দরুন একটু বেশিই ব্লাড ফ্লো হতে থাকে। সেক্ষেত্রে সদ্য একজন মায়ের পক্ষে অতিরিক্ত ব্লাড লস মোটেই ভাল নয়। তাই তাঁরা কুলেখাড়া পাতার রস পান করেন। যদি এই নিয়ে মনে কোনও সন্দেহ থাকে তাহলে একবার ডাক্তারের পরামর্শ অবশ্যই নিয়ে নেবেন।

প্রশ্নঃ খালি পেটে কি কুলেখাড়া পাতার রস খাওয়া যায়?

উত্তরঃ অনেকেই আছেন যারা খালি পেটে সকাল বেলা উঠে এই পাতার রস পান করেন। এখনও পর্যন্ত তাঁদের বিশেষ কোনও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি। তবে কিছু না খেয়ে এই পাতার রস পান করলে গা গুলোতে পারে। সেক্ষেত্রে হাল্কা কিছু খেয়ে তারপর এটা খেতে পারেন।

প্রশ্নঃ কুলেখাড়া পাতা কিভাবে খাবেন?

উত্তরঃ কুলেখাড়ার পাতা ও কাণ্ডের রস খেতে পারেন। আবার অনেকে কুলেখাড়া পাতা শাক রান্না করেও খেয়ে থাকেন। পাতা বা কাণ্ডের রস একটু তেঁতো হয়, তাই যদি সরাসরি খেতে সমস্যা হয়, সেক্ষেত্রে কুলেখাড়ার শাক ভাতের সঙ্গেও খেতে পারেন। তবে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে খান।

প্রশ্নঃ আমি কি প্রতিদিন কুলেখাড়া পাতার রস পান করতে পারি?

উত্তরঃ সেটা নির্ভর করবে আপনার ঠিক কীরকম শারীরিক সমস্যা আছে তার উপর। তবে কোনও কিছুই অতিরিক্ত ভাল নয়। সেক্ষেত্রে একবার ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে নেবেন।

কুলেখাড়া পাতার অপকারিতা বা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া

কুলেখাড়া পাতার অপকারিতা বা পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া ঠিক কীরকম হতে পারে সেটা জেনে নেওয়া দরকার আছে। যে কোনও কিছুর ক্ষেত্রে ভাল দিক যেমন থাকে তেমনি মন্দ দিকও থাকে। বলাই বাহুল্য যে, কুলেখাড়া পাতার ক্ষেত্রেও এই নিয়মের ব্যতিক্রম হয়নি। তাই কুলেখাড়া সেবনের ভালো গুণের পাশাপাশি এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সম্পর্কেও জেনে রাখা উচিত।
কুলেখাড়া-পাতার-অপকারিতা
এই বিশেষ ভেষজ উদ্ভিদ এর পাতা সেবনের ফলে কোনো সমস্যা বা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সম্পর্কে কিছু শোনা যায় নি। তবে যেহেতু এটি একটি ভেষজ উদ্ভিদ বা মেডিসিনাল প্লান্ট তাই বহু যুগ ধরে এর ব্যবহার আমাদের দেশে চলে আসছে। তবুও এর ব্যবহার করার ক্ষেত্রে যেসব বিষয়ের দিকে নজর রাখা উচিত। জেনে নিন কুলেখাড়া পাতা খাওয়ার অপকারিতা গুলো কি কিঃ

গর্ভবতী অবস্থায়ঃ শিশুকে মাতৃদুগ্ধ পান করানোর সময়কালে বা যখন আপনি সন্তান ধারণের পরিকল্পনা করছেন এবং গর্ভবতী অবস্থায় কুলেখাড়া পাতা না খাওয়াই ভাল। তবে যদি খেতে হয় ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে খাওয়াই ভালো।

হরমোনাল ইমব্যালেন্সঃ কুলেখাড়া পাতার মধ্যে থাকা কিছু ফাইটোস্টেরল নারীদের ক্ষেত্রে হরমোনাল ইমব্যালেন্স সৃষ্টি করতে পারে। এই পাতা মেয়ে বা মহিলাদের মাসিক চক্রে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে এবং প্রজনন সংক্রান্ত বিভিন্ন সমস্যার কারণ হতে পারে।

ক্রনিক অ্যালার্জির সমস্যায়ঃ যদি ক্রনিক অ্যালার্জির সমস্যা থাকে তবে এটা না খাওয়া ভালো। যারা হাইপারসেন্সিটিভ তাদের এই পাতা এড়িয়ে চলা উচিত। কিছু মানুষের ক্ষেত্রে কুলেখাড়া পাতা খেলে এ্যালার্জি প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। এ্যালার্জির লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে ত্বকের ফুসকুড়ি, চুলকানি, শ্বাসকষ্ট; এমনকি এনাফাইল্যাক্সিস এর মত সমস্যাও দেখা দিতে পারে, যা একটি জীবন-হুমকিপূর্ণ পরিস্থিতি। যাদের ত্বক সংবেদনশীল, তারা এই পাতা এড়িয়ে চলুন, নয়তো ত্বকের সমস্যা যেমন একজিমা বা ডার্মাটাইটিস সৃষ্টি হতে পারে।

হৃদযন্ত্রের সমস্যায়ঃ কার্ডিয়াক অ্যারিথমিয়া বা অস্বাভাবিক হৃদস্পন্দনের সমস্যায় যারা ভুগছেন, তাদের ক্ষেত্রে এই পাতা বিপজ্জনক হতে পারে। এক কথায় বলতে গেলে কুলেখাড়া পাতা হৃদযন্ত্রের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এই পাতাতে থাকা কিছু উপাদান হার্টের রিদমকে প্রভাবিত করে, তাই এর অতিরিক্ত সেবন কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট এর কারণ হতে পারে।

পেটের সমস্যাঃ অতিরিক্ত পরিমাণে এই পাতা বা কুলেখাড়ার কাণ্ডের রস খাওয়া উচিত না। অতিরিক্ত মাত্রায় কুলেখাড়া খাওয়ার ফলে বদহজম, পাতলা পায়খানা বা ডায়রিয়া হতে পারে।

গ্যাস্ট্রিকের সমস্যাঃ কিছু কিছু ক্ষেত্রে কুলেখাড়া সেবন গ্যাসের সমস্যা হতে পারে। কারও যদি এই ভেষজ সেবন গ্যাস-অম্বলের সমস্যা হয়, তবে কুলেখাড়া এড়িয়ে চলুন। কুলেখাড়া পাতা অতিরিক্ত পরিমাণে খাওয়ার ফলে এটি গ্যাস্ট্রিক সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। এই পাতায় কিছু রাসায়নিক উপাদান রয়েছে যা আমাদের পাকস্থলীতে প্রদাহ সৃষ্টি করে, ফলে এর সেবন পাচনতন্ত্রে বিভিন্ন ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাছাড়াও এই পাতার প্রভাবে অ্যাসিডিটির সমস্যা বাড়াতে পারে, যার ফলে পেটে জ্বালাপোড়া, বুক জ্বালা এবং আলসার হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।

ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশনঃ কুলেখাড়া পাতার অতিরিক্ত সেবনে ইউরিনারি সিস্টেমে প্রদাহ সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনাও থাকে, যা ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশন (UTI) এর ঝুঁকি বাড়ায়।

বিষক্রিয়াঃ কুলেখাড়া পাতার মধ্যে কিছু প্রাকৃতিক বিষাক্ত উপাদান থাকে যা আমাদের শরীরে অতিরিক্ত পরিমাণে প্রবেশ করলে বিষক্রিয়া হতে পারে। কেউ যদি দীর্ঘদিন ধরে এই পাতা নিয়মিতভাবে খায় তবে লিভারের ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, যা লিভার ফেইলিওর এর সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। এই বিষাক্ততা বিশেষত বাচ্চা এবং বয়স্কদের মধ্যে আরও বেশি ঝুঁকি সৃষ্টি করে থাকে, এর কারণ হল তাদের শরীর এই ধরনের রাসায়নিকের বিরুদ্ধে লড়াই করার করার ক্ষমতা কম।

উচ্চ রক্তচাপ এর সমস্যায়ঃ কুলেখাড়া পাতা হাইপারটেনশন বা উচ্চ রক্তচাপ এর সমস্যা যাদের আছে, সেই রোগীদের জন্য ক্ষতিকারক হতে পারে। এই পাতায় থাকা কিছু রাসায়নিক উপাদান আমাদের রক্তচাপকে প্রয়োজনের তুলনায় অনেকটা কমিয়ে দিতে পারে, যার ফলস্বরূপ শরীরে অতিরিক্ত ক্লান্তি, মাথা ঘোরা, এবং অজ্ঞান হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে।

যারা রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের জন্য কোনো ধরনের ওষুধ সেবন করছেন, তাদের এই পাতা সেবন না করাই শ্রেয়। প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া বাঞ্ছনীয়।

ইমিউন সিস্টেমকে দুর্বল করেঃ কুলেখাড়া পাতা অতিরিক্ত খেলে এটি ইমিউন সিস্টেমকে দুর্বল করতে পারে। এই পাতায় থাকা কিছু যৌগ শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতাকে কমিয়ে দেয়, যার ফলে আমাদের শরীর বিভিন্ন সংক্রমণ ও রোগের বিরুদ্ধে লড়াই করতে অসামর্থ্য হয়ে পড়ে।

কিডনির কার্যক্ষমতাকে দুর্বল করেঃ কুলেখাড়া পাতার অতিরিক্ত সেবন আমাদের কিডনির কার্যক্ষমতাকে দুর্বল করে দিতে পারে। এই পাতার মধ্যে এমন কিছু যৌগ থাকে যা কিডনির ফিল্টারিং সিস্টেমের উপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে দেয়, যার ফলে কিডনি স্টোন, কিডনির প্রদাহ, এবং দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগ হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়।

মানসিক স্বাস্থ্যের উপর প্রভাবঃ কুলেখাড়া পাতা মানসিক স্বাস্থ্যের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে, যেমন : অস্বাভাবিক উদ্বেগ এবং অবসাদের সৃষ্টি করতে পারে। কুলেখাড়া পাতার মধ্যে থাকা কিছু উপাদান মস্তিষ্কের সেরোটোনিন এবং ডোপামিনের মাত্রাকে প্রভাবিত করে, এর ফলে আমদের মনের স্বাভাবিক ভারসাম্য বিঘ্নিত হতে পারে।

বিভিন্ন ঔষধ এর সাথে বিক্রিয়াঃ নিয়মিতভাবে বিভিন্ন ঔষধ যারা সেবন করে থাকেন, কুলেখাড়া পাতা তাদের জন্য বিশেষভাবে ক্ষতিকর হতে পারে। অনেক ঔষধের সাথে এই পাতার নেতিবাচক বিক্রিয়া হতে পারে, ফলে ঔষধের কার্যকারিতা কমে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে অথবা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বাড়তে পারে।বিশেষ করে এন্টিকোয়াগুলান্ট, অ্যান্টিহাইপারটেনসিভ সহ কিছু সাইকোট্রপিক ড্রাগ এর সাথে এই পাতার বিক্রিয়া হতে পারে, যা রোগীর জন্য গুরুতর সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে।

কুলেখাড়া পাতা সম্পর্কে শেষ কথা

যুগ যুগ ধরে বিভিন্ন রোগের মহৌষধ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে এই কুলেখাড়া গাছ এবং কুলেখাড়া পাতা। গাছটির পাতা, বীজ, ছাল, শিকড় কোনো কিছুই ফেলনা নয়। বরং প্রত্যেকটি উপাদানের আলাদা আলাদা ঔষধি গুণাগুণ রয়েছে। আবার শাক হিসেবেও কুলেখাড়ার জনপ্রিয়তা তুঙ্গে। কিন্তু বাস্তবতা এটাই যে, অতি আধুনিকায়ন এবং কৃষি সম্প্রসারণের চাপে এই কুলেখাড়া গাছ আজ বিলুপ্তির পথে।

কালেভদ্রেও কুলেখাড়া গাছের দেখা মেলে না বললেই চলে। তবে, গ্রামাঞ্চলের কিছু জায়গায় এই গাছের নাগাল পাওয়া গেলেও শহরাঞ্চলে একেবারেই নেই। তাই আসুন আজ থেকে উপকারী এই ভেষজ উদ্ভিদ রক্ষার চেষ্টা করি এবং ঘরে ঘরে কুলেখাড়া গাছ রোপন করি। এতে করে আমরাই বিভিন্ন ধরনের রোগ ব্যাধি থেকে রক্ষা পাবো। অতএব আশা করছি কুলেখাড়া পাতার উপকারিতা ও অপকারিতা সম্পর্কে জানতে ও বুঝতে পেরেছেন।

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

বিডি টেকল্যান্ডের নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটা কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url