হিট স্ট্রোক থেকে বাঁচার উপায়
হিট স্ট্রোক থেকে বাঁচার উপায় সহ হিট স্ট্রোকের কারণ ও লক্ষণসমূহ জানতে পারবেন
আর্টিকেলটির মাধ্যমে। গ্রীষ্মকালে উচ্চ তাপমাত্রা এবং আর্দ্রতার কারণে হিট
স্ট্রোক গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। তীব্র গরমে দীর্ঘ সময় রোদে থাকলে
বা শারীরিক পরিশ্রম করলে যে কেউ অসুস্থ হয়ে যেতে পারেন।
মানবদেহের স্বাভাবিক তাপমাত্রা ৯৮ দশমিক ৬ ডিগ্রি ফারেনহাইট। কোনো কারণে শরীরের
তাপমাত্রা ১০৪ ডিগ্রির বেশি হয়ে গেলে মানুষের রক্তচাপ কমে যায়, এমনকি অচেতনও হয়ে
পড়তে পারে। এ সমস্যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরিভাষায় হিট স্ট্রোক বলে। যথাসময়ে
চিকিৎসা না করলে মৃত্যুও পর্যন্ত হতে পারে।
পোস্ট সূচিপত্রঃ হিট স্ট্রোক থেকে বাঁচার উপায়
হিট স্ট্রোক কী
হিট স্ট্রোক হলো একটি গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যা, যা শরীরের তাপমাত্রা অত্যধিক
বেড়ে গেলে ঘটে। হিট স্ট্রোক শরীরের তাপমাত্রা ১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট (৪০ ডিগ্রি
সেলসিয়াস) বা তার বেশি হওয়ার একটি অবস্থা। হিট স্ট্রোক তখন ঘটে যখন
শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণকারী প্রক্রিয়া অকার্যকর হয়ে যায়। এটি
সাধারণত দীর্ঘ সময় ধরে তীব্র গরম বা আর্দ্র পরিবেশে থাকার কারণে হয়, বিশেষ
করে যখন শরীর পর্যাপ্ত পরিমাণে তরল ও লবণ হারায় এবং ঠান্ডা হতে পারে না।
স্বাভাবিক অবস্থায় রক্ত দেহের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে। কোনো কারণে
শরীরের তাপমাত্রা বাড়তে থাকলে ত্বকের রক্তনালি প্রসারিত হয় এবং অতিরিক্ত তাপ
পরিবেশে ছড়িয়ে দেয়। প্রয়োজনে ঘামের মাধ্যমেও শরীরের তাপ কমে যায়। কিন্তু
প্রচণ্ড গরম ও আর্দ্র পরিবেশে বেশি সময় অবস্থান বা পরিশ্রম করলে তাপ নিয়ন্ত্রণ
আর সম্ভব হয় না। এতে শরীরের তাপমাত্রা দ্রুত বিপৎসীমা ছাড়িয়ে যায় এবং হিট
স্ট্রোক দেখা দেয়।
হিট স্ট্রোকের কারণসমূহ
হিট স্ট্রোকের কারণসমূহ বিভিন্ন ধরনের হতে পারে। হিট স্ট্রোক একটি গুরুতর
স্বাস্থ্য সমস্যা, যা শরীরের তাপমাত্রা অত্যধিক বেড়ে গেলে ঘটে। হিট স্ট্রোক
সাধারণত অত্যধিক গরমে শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ব্যর্থ হলে ঘটে।
এটি একটি মারাত্মক চিকিৎসাজনিত জরুরি অবস্থা, যা অচেতনতা বা মৃত্যুর কারণ হতে
পারে। নিচে হিট স্ট্রোকের প্রধান কারণগুলো আলোচনা করা হলোঃ
১. উচ্চ তাপমাত্রা ও আর্দ্রতাঃ প্রচণ্ড গরম ও আর্দ্র পরিবেশে দীর্ঘ
সময় থাকলে শরীরের স্বাভাবিক শীতলীকরণ প্রক্রিয়া ব্যাহত হতে পারে। যখন
পরিবেশের তাপমাত্রা অনেক বেশি থাকে এবং আর্দ্রতা বেশি হয়, তখন ঘাম দ্রুত
শুকায় না, ফলে শরীরের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায়। উচ্চ আর্দ্রতা (Humidity)
থাকলে ঘাম দ্রুত শুকাতে পারে না, ফলে শরীরের তাপমাত্রা আরও বৃদ্ধি পায়। এর
ফলে হিট স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ায়।
২. অতিরিক্ত শারীরিক পরিশ্রমঃ প্রচণ্ড রোদের নিচে বা উষ্ণ
আবহাওয়ায় কঠোর শারীরিক পরিশ্রম করলে শরীর অতিরিক্ত গরম হয়ে যেতে পারে।
দীর্ঘ সময় রোদে থাকলে শরীর স্বাভাবিক তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হয়।
গরম আবহাওয়ায় খেলাধুলা, নির্মাণকাজ, কৃষিকাজ, সামরিক প্রশিক্ষণ ইত্যাদির
সময় শরীর প্রচুর তাপ উৎপন্ন করে, যা হিট স্ট্রোক সৃষ্টি করতে পারে।
৩. পর্যাপ্ত পানি না খাওয়াঃ শরীর যখন পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি হারায়,
তখন ঘামের মাধ্যমে তাপ নির্গত হতে পারে না, ফলে তাপমাত্রা বেড়ে যায়।
ডিহাইড্রেশন শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে দুর্বল করে দেয়।
৪. বয়স্ক ও শিশুদের সংবেদনশীলতাঃ শিশু ও বয়স্ক ব্যক্তিদের
তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা তুলনামূলকভাবে দুর্বল হওয়ায় তাদের হিট
স্ট্রোকের ঝুঁকি বেশি থাকে। শিশুরা তাপমাত্রার দ্রুত পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ
খাওয়াতে পারে না। বয়স্ক ব্যক্তিরা বয়সের কারণে শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ
ব্যবস্থায় দুর্বল হয়ে পড়ে এবং তারা সহজেই হিট স্ট্রোকের শিকার হতে পারেন।
৫. সংবদ্ধ জায়গায় দীর্ঘ সময় থাকাঃ যেখানে পর্যাপ্ত বাতাস চলাচল কম
সেখানে হিট স্ট্রোকের সম্ভাবনা বেশি থাকে, যেমন-গরম গাড়ির ভেতর,
ভেন্টিলেশনবিহীন ঘর বা ঘনবসতিপূর্ণ পরিবেশ, সেখানে তাপমাত্রা দ্রুত বেড়ে
যেতে পারে। ছোট শিশুকে গরম গাড়ির ভেতর রেখে দিলে কয়েক মিনিটের মধ্যেই তার
শরীরের তাপমাত্রা মারাত্মকভাবে বেড়ে যেতে পারে।
৬. ভারী ও গাঢ় রঙের পোশাক পরাঃ মোটা ও আঁটসাঁট পোশাক শরীর থেকে তাপ
বের হতে বাধা দেয়, ফলে শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে যায়। গরমের দিনে গাঢ় রঙের
পোশাকও তাপ শোষণ করে এবং শরীরকে বেশি গরম করে তোলে।
৭. কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াঃ উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ,
ডায়াবেটিস বা অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদী রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের তাপমাত্রা
নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা কমে যেতে পারে। কিছু ওষুধ যেমন ডিউরেটিক্স (Diuretics),
এন্টিহিস্টামিন, বিটা-ব্লকার ইত্যাদি শরীরের শীতলীকরণ প্রক্রিয়াকে
বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
- ডিউরেটিক্সঃ শরীর থেকে পানি বের করে দেয়, ফলে ডিহাইড্রেশন হয়।
- এন্টিহিস্টামিন ও বিটা-ব্লকারঃ ঘাম কমিয়ে শরীরের স্বাভাবিক শীতলীকরণ প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
- অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট ও অ্যান্টিসাইকোটিক ওষুধঃ মস্তিষ্কের তাপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করতে পারে।
৮. অ্যালকোহল বা ক্যাফেইনযুক্ত পানীয় সেবনঃ অ্যালকোহল এবং ক্যাফেইন
ডিহাইড্রেশন ঘটাতে পারে এবং শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ব্যাহত করতে
পারে।অ্যালকোহল শরীরের পানি ধরে রাখার ক্ষমতা কমিয়ে দেয় এবং ডিহাইড্রেশন
ঘটায়। ক্যাফেইন (যেমন: কফি, এনার্জি ড্রিংকস) শরীরে পানির ঘাটতি তৈরি করে,
যা হিট স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ায়
হিট স্ট্রোকের লক্ষণসমূহ
হিট স্ট্রোক (Heat Stroke) তাপজনিত একটি গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যা যা শরীরের
তাপমাত্রা অত্যাধিক বেড়ে যাওয়ার কারণে ঘটে। এটি তাপের প্রভাবে শরীরের তাপ
নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ভেঙে যায়, এবং তখন শরীর নিজেই তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে
পারে না। এতে তাপমাত্রা ১০৪°F (৪০°C) বা তার বেশি হতে পারে। হিট স্ট্রোকের
কারণে মস্তিষ্ক, হৃদযন্ত্র, কিডনি এবং অন্যান্য অঙ্গের ক্ষতি হতে পারে। এটি
দ্রুত চিকিৎসা না করা হলে জীবনহানির কারণ হতে পারে।
হিট স্ট্রোকের লক্ষণসমূহঃ
শরীরের তাপমাত্রা বৃদ্ধিঃ হিট স্ট্রোকে আক্রান্ত হলে শরীরের
তাপমাত্রা ১০৪°F (৪০°C) বা তার বেশি হয়ে যেতে পারে। তাপমাত্রা বেশি হলে,
শরীরের তাপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কাজ করা বন্ধ করে দেয়, যার ফলে শরীর
অতিরিক্ত তাপ শোষণ করতে থাকে।
ত্বকের শুকনো এবং গরম অনুভূতিঃ হিট স্ট্রোকের একটি প্রধান লক্ষণ হলো
ত্বক শুকনো হয়ে যায় এবং গরম অনুভূতি হয়। সাধারণত শরীর ঘাম করা বন্ধ করে
দেয়, যা তাপ শীতল করার প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া।ত্বক লাল বা কালো হতে পারে, এবং
শরীরের তাপমাত্রা হঠাৎ বেড়ে যাওয়ার কারণে ত্বকে স্নিগ্ধতা হারিয়ে যায়।
বিভ্রান্তি বা মানসিক অবস্থার পরিবর্তনঃ হিট স্ট্রোকের কারণে
মস্তিষ্কে অক্সিজেন ও গ্লুকোজের সরবরাহ কমে যায়, ফলে বিভ্রান্তি, বেহুঁশি,
অজ্ঞানতা বা অস্বাভাবিক আচরণ দেখা দিতে পারে। এর ফলে ব্যক্তি অস্বাভাবিক
কথা বলতে পারে বা তার চারপাশের পরিস্থিতি বুঝতে পারবে না।
শ্বাসকষ্ট ও হৃদযন্ত্রের সমস্যাঃ শ্বাসকষ্ট হতে পারে এবং শ্বাস খুব
দ্রুত বা অস্বাভাবিক হতে পারে।হৃদস্পন্দন দ্রুত হতে পারে বা অনিয়মিত হতে
পারে। কিছু ক্ষেত্রে, হৃদরোগের সমস্যা হতে পারে, যেমন হার্ট অ্যাটাকের
ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে।
মাথাব্যথা এবং ক্লান্তিঃ হিট স্ট্রোকের কারণে তীব্র মাথাব্যথা এবং
ক্লান্তি অনুভূত হতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে মাথাব্যথা সহ মস্তিষ্কের ক্ষতি
হতে পারে।
মাংসপেশির খিঁচুনি বা টানঃ পেশীতে খিঁচুনি বা টান অনুভূতি হতে পারে।
বিশেষত পেশীগুলোর তাপমাত্রা বাড়লে এটি খুবই সাধারণ লক্ষণ।
বেহুঁশ বা অচেতন অবস্থাঃ হিট স্ট্রোকের ফলে ব্যক্তি বেহুঁশ হয়ে যেতে
পারে, এবং কিছু ক্ষেত্রে অচেতন হয়ে পড়ে। যদি দ্রুত চিকিৎসা না করা হয়, তবে
অচেতন অবস্থা স্থায়ী হতে পারে।
হিট স্ট্রোক থেকে বাঁচার উপায়
হিট স্ট্রোক থেকে বাঁচার উপায় হিসাবে কিছু সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন।
হিট স্ট্রোক খুবই বিপজ্জনক এবং সময়মতো চিকিৎসা না করালে মৃত্যুও ঘটতে পারে।
তীব্র গরম আবহাওয়ার কারণে শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা হারায়। এর
ফলে বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা যেমন মাথা ঘোরা, বিভ্রান্তি, বমি, শরীরের আংশিক
বা পুরো অংশ অবশ হয়ে যাওয়া এবং তীব্র ক্লান্তি দেখা দিতে পারে। হিট স্ট্রোক
থেকে বাঁচতে নিচের পদক্ষেপগুলো দেখে নিন।
আরও পড়ুনঃ শীতকালীন রোগ ও তার প্রতিকারের উপায়
১. ঠাণ্ডা পরিবেশে থাকুনঃ হিট স্ট্রোকের ঝুঁকি কমানোর জন্য,
তাপমাত্রা বেশি হলে, বাইরে যাওয়ার পরিবর্তে শীতল ও আর্দ্র পরিবেশে থাকতে
চেষ্টা করুন। গরমের সময়ে যেখানেই থাকুন, চেষ্টা করুন শীতল পরিবেশে অবস্থান
করতে। এসি, ফ্যান বা শীতল কক্ষে বসে থাকার চেষ্টা করুন। খোলামেলা পরিবেশে
থাকলে ছায়ায় বা ঘরের ভিতর চলে যান।
২. পর্যাপ্ত পানি পান করুনঃ হিট স্ট্রোকের কারণ হতে পারে শরীরে
জলশূন্যতা (ডিহাইড্রেশন)।শরীরে পানির অভাব হিট স্ট্রোকের একটি প্রধান কারণ।
শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পর্যাপ্ত পানি পান করুন। গরম আবহাওয়ায়
প্রতি ঘণ্টায় অন্তত এক গ্লাস পানি পান করা উচিত। তবে, সঠিক মাত্রায় সল্ট বা
খনিজ দ্রব্য (যেমন ইলেকট্রোলাইটস) ধারণকারী পানীয় খাওয়াও সহায়ক।
৩. হালকা ও শ্বাসপ্রশ্বাসযোগ্য পোশাক পরুনঃ অস্বস্তিকর গরম থেকে
রক্ষা পেতে হালকা রঙের, পাতলা এবং শ্বাসপ্রশ্বাসযোগ্য কাপড় পরুন। গরম
পরিবেশে বেশি ভারী এবং অস্বস্তিকর পোশাক পরলে শরীর গরম হতে পারে। তাই,
হালকা রঙের, শ্বাসপ্রশ্বাসযোগ্য এবং পাতলা কাপড় পরুন যাতে শরীর ঠাণ্ডা থাকে
এবং ঘামের মাধ্যমে তাপ নির্গত হয়।
৪. গরম সময়ে বাইরে না যাওয়ার চেষ্টা করুনঃ গরম তাপমাত্রা বা সূর্যের
তেজ যখন সবচেয়ে বেশি থাকে, তখন বাইরে বের না হওয়ার চেষ্টা করুন। সকাল বা
সন্ধ্যার দিকে বাইরে যাওয়ার পরিকল্পনা করুন। এছাড়া বাইরে বের হলে মাঝে মাঝে
বিশ্রাম নিতে এবং ঠাণ্ডা জায়গায় বসে থাকতে হবে।
৫. শরীরের তাপমাত্রা কমানোর ব্যবস্থা নিনঃ যদি আপনি বা অন্য কেউ হিট
স্ট্রোকে আক্রান্ত হন, দ্রুত শরীরের তাপমাত্রা কমাতে ভেজা কাপড় দিয়ে শরীর
মুছুন। ঠাণ্ডা পানিতে স্নান বা পানিতে ভিজিয়ে শরীর শীতল করতে সাহায্য করবে।
তবে পানি অতিরিক্ত ঠাণ্ডা হলে তা বিপজ্জনক হতে পারে, তাই সতর্কতা অবলম্বন
করুন।
৬. অতিরিক্ত শারীরিক পরিশ্রম থেকে বিরত থাকুনঃ গরম পরিবেশে অতিরিক্ত
শারীরিক পরিশ্রম, যেমন দৌড়ানো, ভারী কাজ করা ইত্যাদি এড়িয়ে চলুন। পর্যাপ্ত
বিশ্রাম নিন এবং চেষ্টা করুন শীতল পরিবেশে থাকার।
৭. খাদ্য গ্রহণে সতর্কতাঃ গরমের সময়ে বেশি মিষ্টি, তেলতেলেভাজা বা
ভারী খাবার এড়িয়ে চলুন। সেগুলো শরীরকে অতিরিক্ত কাজ করতে বাধ্য করে, যার
ফলে তাপ উৎপন্ন হতে পারে। এছাড়া অধিক তেল, নুন বা শর্করা জাতীয় খাবার গরমে
শরীরকে অতিরিক্ত কাজ করতে বাধ্য করে, যা হিট স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ায়। তাই
সহজ, হালকা ও পুষ্টিকর খাবার খান। এর পরিবর্তে, তাজা ফল, শাকসবজি এবং
প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার খাওয়ার চেষ্টা করুন।
৮. পদক্ষেপ নিন তৎক্ষণাৎ যদি কারো হিট স্ট্রোক হয়ঃ যদি কেউ হিট
স্ট্রোকের লক্ষণ দেখায় (যেমন অতিরিক্ত ঘাম, মাথা ঘোরা, বমি করা, ত্বকের
তাপমাত্রা বেশি হওয়া), তখন তাকে শীতল পরিবেশে নিন, তার শরীর ঠাণ্ডা করতে
ভেজা কাপড় ব্যবহার করুন এবং দ্রুত চিকিৎসা নিন। আশা করি, হিট স্ট্রোক থেকে
বাঁচার উপায় জানতে পেরেছেন।
হিট স্ট্রোকের প্রকারভেদ
হিট স্ট্রোকের প্রকারভেদ সাধারণত দুই ধরনের হয়ে থাকে, অ্যাকিউট হিট স্ট্রোক
(Acute Heat Stroke) এবং সানস্ট্রোক (Sunstroke)। তবে এই দুই ধরনের হিট
স্ট্রোকের মধ্যে কিছু সাদৃশ্য এবং পার্থক্য রয়েছে। অ্যাকিউট হিট স্ট্রোক
দ্রুত ঘটে এবং শরীরের তাপমাত্রা খুব দ্রুত বাড়ে ও সানস্ট্রোক সাধারণত
গ্রীষ্মকালে সূর্যের তাপে দীর্ঘসময় বাইরে থাকার কারণে সানস্ট্রোক ঘটে। এতে
শরীরের তাপমাত্রা দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং ত্বক শুকিয়ে যায়। বিস্তারিত দেখে নিনঃ
১. অ্যাকিউট হিট স্ট্রোক (Acute Heat Stroke)
অ্যাকিউট হিট স্ট্রোক তীব্র তাপমাত্রার কারণে হঠাৎ ঘটে এবং এটি অত্যন্ত
বিপজ্জনক। এটি এমন এক পরিস্থিতি যেখানে শরীরের তাপমাত্রা দ্রুত বেড়ে যায়
এবং শরীরের তাপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা পুরোপুরি অক্ষম হয়ে যায়। অ্যাকিউট হিট
স্ট্রোক সাধারণত শরীরের তাপমাত্রা ১০৪°F (৪০°C) বা তার বেশি উঠলে ঘটে, এবং
এটি দ্রুত চিকিৎসা না করা হলে মৃত্যুর কারণ হতে পারে।
লক্ষণসমূহঃ
- শরীরের তাপমাত্রা ১০৪°F (৪০°C) বা তার বেশি বেড়ে যায়।
- ত্বক গরম, শুকনো এবং লাল হয়ে যায়, ঘাম বন্ধ হয়ে যায়।
- বিভ্রান্তি বা অচেতনতা হতে পারে।
- শ্বাসের অস্বাভাবিকতা (শ্বাস দ্রুত বা বন্ধ হয়ে যেতে পারে)।
- হৃদস্পন্দন দ্রুত হওয়া বা অনিয়মিত হতে পারে।
- মাথাব্যথা বা ক্লান্তি অনুভূতি।
- মাংসপেশীর খিঁচুনি বা টান হতে পারে।
- শরীরের অভ্যন্তরীণ অঙ্গগুলোর (যেমন মস্তিষ্ক, হৃদযন্ত্র, কিডনি) ক্ষতি হতে পারে।
- পেশী বা শরীরের অংশে অস্বাভাবিক অনুভূতি বা টান।
- তীব্র গরম আবহাওয়াঃ গরম পরিবেশে দীর্ঘ সময় থাকতে হলে শরীর অতিরিক্ত তাপ শোষণ করতে থাকে।
- অতিরিক্ত শারীরিক পরিশ্রমঃ গরম আবহাওয়ার মধ্যে কঠোর শারীরিক কাজ করা।
- ডিহাইড্রেশন বা পানির অভাবঃ শরীরের মধ্যে পর্যাপ্ত তরল না থাকলে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
- অ্যালকোহল বা মাদকঃ কিছু মাদক বা অ্যালকোহল শরীরের তাপ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে।
- অতিরিক্ত পোশাকঃ শরীরে অতিরিক্ত কাপড় পরলে শরীরের তাপ দ্রুত বাড়তে পারে।
চিকিৎসা ও প্রতিকারঃ
- আক্রান্ত ব্যক্তিকে শীতল পরিবেশে সরিয়ে নিয়ে আসুন।
- শরীরের তাপমাত্রা কমাতে ঠান্ডা পানি বা বরফ ব্যবহার করুন (যতটা সম্ভব তাড়াতাড়ি)।
- পানি বা ইলেকট্রোলাইট সমৃদ্ধ তরল পান করতে দিন (যদি ব্যক্তি অচেতন না হন)।
- অন্তত ২০-৩০ মিনিটের মধ্যে চিকিৎসা নিশ্চিত করুন।
২. সানস্ট্রোক (Sunstroke)
সানস্ট্রোক হিট স্ট্রোকের একটি বিশেষ প্রকার, যা মূলত সূর্যের তাপের কারণে
ঘটে। এটি সাধারণত তখন ঘটে যখন কেউ দীর্ঘ সময় ধরে সরাসরি সূর্যের তাপে থাকে,
বিশেষত গ্রীষ্মকালে, এবং শরীরের তাপমাত্রা দ্রুত বেড়ে যায়। সানস্ট্রোক
সাধারণত অগ্রিম শারীরিক সমস্যার কারণে ঘটে না, তবে এটি শরীরের তাপমাত্রা
নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হওয়ার ফলস্বরূপ হয়।
লক্ষণসমূহঃ
- শরীরের তাপমাত্রা ১০৪°F (৪০°C) বা তার বেশি উঠতে পারে।
- ত্বক গরম, শুকনো এবং লাল হয়ে যায়, ঘাম বন্ধ হয়ে যায় (অথচ সাধারণভাবে শরীরের তাপ শীতল করার জন্য ঘাম নির্গত হয়)।
- মাথাব্যথা এবং বমি হতে পারে।
- ক্লান্তি বা দুর্বলতা অনুভূতি হতে পারে।
- শরীরের ভিতরে অস্বস্তি বা অশান্তি হতে পারে।
- শ্বাসকষ্ট বা হৃদস্পন্দন বৃদ্ধি পেতে পারে।
- অচেতনতা বা বিভ্রান্তি হতে পারে।
কারণসমূহঃ
- সূর্যের তাপে দীর্ঘ সময় বাইরে থাকাঃ সূর্যের তাপ সরাসরি শরীরের উপর প্রভাব ফেলে এবং শরীর তাপ শোষণ করতে থাকে।
- অতিরিক্ত শারীরিক পরিশ্রমঃ ভারী কাজ বা ব্যায়াম গরম আবহাওয়ায় করা হলে শরীরের তাপমাত্রা দ্রুত বেড়ে যায়।
- পানি ও তরল পানির অভাবঃ পর্যাপ্ত পানি না পান করলে শরীরের তাপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ব্যাহত হয়।
- গরম আবহাওয়াঃ গ্রীষ্মকালে তীব্র তাপমাত্রা শরীরের তাপ নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে সানস্ট্রোক হতে পারে।
- প্রথমত ঠান্ডা পরিবেশে স্থানান্তর করুন।
- শরীরের তাপমাত্রা কমাতে ঠান্ডা পানি বা বরফ ব্যবহার করুন।
- পানি বা ইলেকট্রোলাইট সমৃদ্ধ তরল পান করান, তবে নিশ্চিত করুন যে ব্যক্তি অচেতন না হন।
- চিকিৎসকের সাহায্য নিন যদি লক্ষণগুলি গুরুতর হয়ে যায়।
হিট স্ট্রোকের প্রাথমিক প্রতিকার
হিট স্ট্রোক (Heat Stroke) একটি গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যা যা শরীরের তাপমাত্রা
অত্যধিক বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে ঘটে। এটি সাধারণত গরম আবহাওয়ায়, অতিরিক্ত
শারীরিক পরিশ্রম, বা জল শূন্যতা (dehydration) কারণে ঘটে। এটি যদি তাড়াতাড়ি
এবং সঠিকভাবে চিকিৎসা না করা হয়, তবে এটি জীবননাশক হতে পারে। হিট স্ট্রোকের
প্রাথমিক প্রতিকার সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য নিচে দেওয়া হলোঃ
ত্বরিত ঠান্ডা করাঃ আক্রান্ত ব্যক্তিকে যত দ্রুত সম্ভব শীতল স্থানে
সরিয়ে নিয়ে যান (যেমন শেড বা এয়ার কন্ডিশনড রুমে)। যদি বাইরে থাকেন, তবে তাকে
যে কোনও ছায়াযুক্ত জায়গায় নিয়ে যান। গরম থেকে তাকে পুরোপুরি সরিয়ে নিন। হালকা
এবং শীতল পোশাক পরানোর চেষ্টা করুন।
ঠান্ডা পানি ব্যবহারঃ আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরের তাপ কমানোর জন্য
ঠান্ডা পানি দিয়ে ভিজানো কাপড় দিয়ে ঘষুন বা শরীরের বিভিন্ন অংশে পানি ঢালুন
(মাথা, গলা, হাত, পা)। হালকা ঠান্ডা পানিতে আক্রান্ত ব্যক্তির গোসল করান,
কিন্তু যদি আপনি জলপূর্ণ বা স্নান করতে পারেন তবে তা আরও ভালো।
পানি বা ইলেকট্রোলাইট পান করানোঃ আক্রান্ত ব্যক্তিকে পানি বা পানীয়
(যেমন গেটোরেড, বা অন্যান্য ইলেকট্রোলাইট সমৃদ্ধ পানীয়) পান করান। এই ধরনের
পানীয় শরীরের জল ও লবণের ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করে। তবে, যদি
আক্রান্ত ব্যক্তি অজ্ঞান হয়ে যান বা কথা বলতে না পারেন, তাকে পানীয় দেওয়ার
চেষ্টা করবেন না, কারণ এটি দম আটকে যেতে পারে।
চিকিৎসকের সহায়তা নেওয়াঃ হিট স্ট্রোকের লক্ষণগুলো যদি গুরুতর হয়ে ওঠে,
তাহলে দ্রুত অ্যাম্বুলেন্স ডেকে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যান। হিট স্ট্রোক
আক্রান্ত ব্যক্তিকে অবশ্যই হাসপাতালে ভর্তি করা প্রয়োজন হতে পারে, যেখানে
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা আরও উন্নত চিকিৎসা প্রদান করতে পারেন।
অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা পর্যবেক্ষণঃ শরীরের তাপমাত্রা ১০৪°F (৪০°C) বা
তার বেশি হতে থাকলে, তা কমানোর জন্য দ্রুত ব্যবস্থা নিন। তাপমাত্রা যত দ্রুত
কমানো যায়, ততই হিট স্ট্রোকের পরিণতি কম ভয়াবহ হতে পারে।
হিট স্ট্রোক কাদের বেশি হয়
হিট স্ট্রোক কাদের বেশি হয় যারা সাধারণত এমন পরিবেশে থাকেন বা কাজ করেন
যেখানে উচ্চ তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা বিদ্যমান। প্রচণ্ড গরমে ও আর্দ্রতায় যে
কারও হিট স্ট্রোক হতে পারে। হিট স্ট্রোক সাধারণত বেশি হয় যাদের শরীর
অতিরিক্ত গরম সহ্য করতে পারে না বা যারা দীর্ঘ সময় ধরে তীব্র গরম পরিবেশে
থাকে। এছাড়া, কিছু নির্দিষ্ট শারীরিক অবস্থা এবং জীবনধারা হিট স্ট্রোকের
ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে, যেমনঃ
১. বয়স্ক ও শিশুঃ শিশু ও বৃদ্ধদের তাপ নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা কম
থাকায় হিট স্ট্রোকের সম্ভাবনা বেড়ে যায়। এ ছাড়া বয়স্ক ব্যক্তিরা যেহেতু
প্রায়ই বিভিন্ন রোগে ভোগেন কিংবা নানা ওষুধ সেবন করেন, যা হিট স্ট্রোকের
ঝুঁকি বাড়ায়। ৬৫ বছরের বেশি বয়সী প্রবীণরা এবং ৫ বছরের কম বয়সী শিশুরা
তাপমাত্রার পরিবর্তনের সঙ্গে সহজে মানিয়ে নিতে পারে না, তাই তারা বেশি
ঝুঁকিতে থাকে।
২. শারীরিক পরিশ্রমকারী ব্যক্তিঃ যাঁরা দিনের বেলায় প্রচণ্ড
রোদে কায়িক পরিশ্রম করেন, তাঁদের হিট স্ট্রোকের ঝুঁকি বেশি।যেমন
নির্মাণ শ্রমিক, কৃষিকাজ করা ব্যক্তি, রিকশাচালক ও ক্রীড়াবিদ, তাদের শরীর
অতিরিক্ত গরম হয়ে হিট স্ট্রোকের শিকার হতে পারে।
৩. স্থূলতা বা অতিরিক্ত ওজন থাকা ব্যক্তিঃ বেশি ওজন হলে
শরীরের তাপমাত্রা সহজে বের হতে পারে না এবং শরীর বেশি গরম হয়ে যায়। ফলে
তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়।
৪. যারা নির্দিষ্ট ওষুধ গ্রহণ করেনঃ কিছু ওষুধ, যেমন উচ্চ
রক্তচাপ, এলার্জি বা ডিপ্রেশনের ওষুধ, শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ
প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। যেমনঃ
- ডায়ুরেটিকস (Diuretics): যেগুলো প্রস্রাবের মাধ্যমে শরীর থেকে পানি বের করে দেয়।
- অ্যান্টিহিস্টামিন (Antihistamines): যা অ্যালার্জির চিকিৎসায় ব্যবহার করা হয় এবং ঘাম কমায়।
- অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট (Antidepressants): মানসিক সমস্যার চিকিৎসায় ব্যবহৃত ওষুধ যা শরীরের তাপ নিয়ন্ত্রণে সমস্যা তৈরি করতে পারে।
- রক্তচাপ ও হৃদরোগের ওষুধ: বিশেষ করে বিটা ব্লকার (Beta-blockers)
৫. ডিহাইড্রেশন থাকা ব্যক্তিঃ শরীরে পানিস্বল্পতা হলে হিট
স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ে।যারা পর্যাপ্ত পানি পান করেন না বা শরীরে পানির
ঘাটতি আছে, তাদের হিট স্ট্রোকের ঝুঁকি বেশি থাকে। ঘামের মাধ্যমে শরীর
ঠান্ডা থাকে। কিন্তু যারা কম পানি পান করেন, তাদের শরীরে তরল ও লবণের
ঘাটতি হয়, যা হিট স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ায়।
৬. হৃদরোগ ও উচ্চ রক্তচাপ রোগীরাঃ যারা হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ
বা অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি রোগে ভুগছেন, তাদের শরীরের স্বাভাবিক কুলিং
সিস্টেম ঠিকভাবে কাজ নাও করতে পারে।
৭. অ্যালকোহল বা ক্যাফেইন বেশি গ্রহণকারীরাঃ অ্যালকোহল ও
ক্যাফেইন শরীর থেকে অতিরিক্ত পানি বের করে দেয়, যা ডিহাইড্রেশন বাড়ায় ও
হিট স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ায়।
হিট স্ট্রোকের প্রতিরোধ ব্যবস্থা
হিট স্ট্রোকের প্রতিরোধ ব্যবস্থা খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি একটি গুরুতর
স্বাস্থ্য সমস্যা হতে পারে, যা প্রাথমিক পদক্ষেপের মাধ্যমে ঠেকানো
সম্ভব। এটি শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করে
এবং জরুরি চিকিৎসা না পেলে মারাত্মক হতে পারে। তবে কিছু প্রতিরোধমূলক
ব্যবস্থা গ্রহণ করলে হিট স্ট্রোকের ঝুঁকি কমানো সম্ভব। নিচে হিট স্ট্রোক প্রতিরোধে কিছু কার্যকরী পরামর্শ দেওয়া হলোঃ
১. প্রচুর পানি পান করাঃ গরম আবহাওয়ার মধ্যে শরীরের পানি শূন্যতা
(dehydration) খুব দ্রুত হতে পারে, যা হিট স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ায়। প্রচুর
পরিমাণে পানি পান করুন, বিশেষ করে গরমের সময়ে বা শারীরিক পরিশ্রমের পর। দিনে
অন্তত ৮-১০ গ্লাস পানি পান করুন। ইলেকট্রোলাইট সমৃদ্ধ পানীয় গ্রহণ করুন।
পানীয় যেমন গেটোরেড বা অন্যান্য ইলেকট্রোলাইট সমৃদ্ধ পানীয়ও শরীরের লবণ ও
পানি ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে।
২. গরম পরিবেশ থেকে দূরে থাকাঃ গরম এবং আর্দ্র আবহাওয়ার মধ্যে
বেশিক্ষণ অবস্থান করবেন না। বিশেষ করে দুপুর ১২টা থেকে ৩টার মধ্যে রোদে বের
হওয়া এড়িয়ে চলুন। বাইরে যেতে হলে ছাতা বা হ্যাট ব্যবহার করুন এবং সূর্যের
আলো থেকে রক্ষা পাওয়ার চেষ্টা করুন।
৩. হালকা ও শীতল পোশাক পরিধানঃ গরম আবহাওয়ায় হালকা এবং ঢিলেঢালা পোশাক
পরিধান করুন যা বাতাস চলাচল করতে দেয়। সুতির কাপড় শীতল রাখে এবং ত্বকে ঘাম
শোষণ করতে সাহায্য করে। কালো রঙের পোশাক পরিধান থেকে বিরত থাকুন, কারণ গা
কালো রঙ সূর্যের তাপ শোষণ করে যা শরীরের তাপমাত্রা বাড়িয়ে দেয়।
৪. বিরতি নেওয়াঃ দীর্ঘসময় গরম অবস্থায় কাজ করলে মাঝে মাঝে বিশ্রাম
নিতে হবে, বিশেষ করে যখন আপনি শারীরিক পরিশ্রম করছেন। ঠান্ডা জায়গায় বসে
বিশ্রাম নিন এবং শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখুন। একে একে কাজ করুন এবং
গরমের মধ্যে কাজ করার সময়ে পর্যাপ্ত বিরতি নিন।
৫. শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখাঃ গরম আবহাওয়ার মধ্যে শরীরকে শীতল
রাখতে শরীরের বিভিন্ন অংশে ঠান্ডা পানি ব্যবহার করুন (যেমন, মুখ, হাত, পা,
গলা)। ঠান্ডা জায়গায় বসে থাকুন, শীতল পানিতে গোসল করুন, এবং দরকার হলে এয়ার
কন্ডিশনার বা ফ্যান ব্যবহার করুন।
৬. শরীরের অবস্থার প্রতি মনোযোগী হওয়াঃ শারীরিক অবস্থা মনোযোগ সহকারে
পর্যবেক্ষণ করুন। অতিরিক্ত ঘাম বা তীব্র মাথাব্যথা, মাড়ি শুকিয়ে যাওয়া, বমি
বোধ এবং অস্বাভাবিক শ্বাসপ্রশ্বাস যদি দেখা দেয়, তা হলে দ্রুত বিশ্রাম নিন
এবং ঠান্ডা পরিবেশে চলে যান।
৭. শারীরিক পরিশ্রমের সময়ে সতর্কতাঃ গরমের মধ্যে অধিক শারীরিক পরিশ্রম
করতে না যাওয়ার চেষ্টা করুন। তবে, যদি কোনও খেলাধুলা বা ভারী কাজের জন্য
বাহিরে বের হন, তবে পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও পানি পান করুন। নিয়মিত বিরতি নিয়ে
শরীরের তাপমাত্রা কমানোর চেষ্টা করুন।
৮. বয়স্ক এবং শিশুদের প্রতি বিশেষ যত্নঃ বয়স্ক মানুষ এবং ছোট শিশুদের
প্রতি বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে, কারণ তাদের শরীর তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ
করতে সমস্যায় পড়তে পারে। তাদের প্রচুর পানি পান করানো এবং গরম আবহাওয়ায় বাইরে
না পাঠানো ভালো।
৯. পূর্ববর্তী স্বাস্থ্য সমস্যাঃ যারা উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, অথবা
অন্যান্য শারীরিক সমস্যা (যেমন কিডনি রোগ) ভোগেন, তাদের গরম আবহাওয়ায় সতর্ক
থাকতে হবে। তাদের জন্য প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নেয়ার আগে গরমে বাইরে না যাওয়াই
শ্রেয়।
১০. ব্যায়াম বা কসরত করার সময় সতর্কতাঃ গরমের সময়ে কঠিন ব্যায়াম বা
কসরত করার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকুন। যদি ব্যায়াম করার পরিকল্পনা থাকে, তবে
ঠান্ডা পরিবেশে তা করুন এবং পর্যাপ্ত পানি পান করতে ভুলবেন না।
এইসব পদক্ষেপ অনুসরণ করে গরম আবহাওয়ার মধ্যে হিট স্ট্রোকের ঝুঁকি কমানো
সম্ভব। সঠিকভাবে সতর্কতা অবলম্বন করলে হিট স্ট্রোক প্রতিরোধ করা যেতে পারে।
হিট স্ট্রোকের প্রাকৃতিক এবং ঘরোয়া প্রতিকার
হিট স্ট্রোকের প্রাকৃতিক এবং ঘরোয়া প্রতিকার খুবই গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে,
বিশেষ করে যখন চিকিৎসকের সাহায্য প্রাপ্তি সহজসাধ্য না হয়। তবে, মনে রাখতে
হবে যে হিট স্ট্রোক খুবই গুরুতর সমস্যা এবং এটি প্রাথমিক চিকিৎসা এবং দ্রুত
হাসপাতালের সহায়তা চাওয়ার দাবি রাখে। তবুও, ঘরোয়া কিছু উপায় রয়েছে যা হালকা
আক্রমণের ক্ষেত্রে উপকারী হতে পারে। হিট স্ট্রোকের প্রাকৃতিক এবং ঘরোয়া
প্রতিকারগুলো হলোঃ
১. ঠান্ডা পানি দিয়ে স্নান বা গোসলঃ হালকা ঠান্ডা পানিতে গোসল করুন বা
শরীরের বিভিন্ন অংশে ঠান্ডা পানি দিয়ে ভিজানো কাপড় দিয়ে ঘষুন। বিশেষ করে
মাথা, গলা, হাত, পা এবং পিঠে পানি প্রয়োগ করলে তাপমাত্রা কমানো যেতে পারে।
ঠান্ডা পানি ত্বক শীতল করে এবং শরীরের তাপমাত্রা দ্রুত কমায়।
২. শসা ব্যবহারঃ শসা ত্বককে শীতল করে এবং শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে
রাখতে সাহায্য করে। শসা টুকরা করে তা শরীরের ত্বকে লাগান, বিশেষ করে গলা, মুখ
এবং পিঠে। শসা ত্বককে ঠান্ডা রাখে এবং ত্বকের আর্দ্রতা বজায় রাখে, যা তাপ
কমানোর প্রাকৃতিক উপায়।
৩. পুদিনা পাতা ও এলোভেরাঃ পুদিনা পাতার রস বা এলোভেরা জেল সরাসরি
শরীরে লাগাতে পারেন। পুদিনা মাংসল ত্বকে শীতল অনুভূতি দেয় এবং এলোভেরা ত্বকের
জন্য উপকারী। পুদিনা তাজা অনুভূতি দেয় এবং এলোভেরা ত্বককে শীতল করে, পাশাপাশি
ইনফ্লেমেশন কমাতে সাহায্য করে।
৪. বেসন ও গরম পানিঃ ২-৩ টেবিল চামচ বেসন গরম পানির সাথে মিশিয়ে পেস্ট
তৈরি করুন এবং তা শরীরের ত্বকে লাগান। এটি শরীরের অতিরিক্ত তেল শুষে নেবে এবং
শরীর শীতল রাখবে। বেসন ত্বককে শীতল রাখতে এবং অতিরিক্ত তেল শোষণ করতে সহায়ক।
৫. গোলমরিচ ও মধুঃ একটি গ্লাস গরম পানিতে ১/৪ চামচ গোলমরিচ গুঁড়া এবং
১ চামচ মধু মিশিয়ে পান করুন। গোলমরিচ শরীরের তাপ কমাতে সাহায্য করে এবং মধু
শরীরের আর্দ্রতা বজায় রাখে।
৬. তুলসি পাতা ও মধুঃ ৩-৪টি তুলসি পাতা ভালো করে মুচড়ে এক চামচ মধুর
সাথে মিশিয়ে খেতে পারেন। এটি শরীরের তাপমাত্রা কমাতে সাহায্য করবে। তুলসি
পাতার অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট এবং ঠান্ডা করার গুণাগুণ শরীরের তাপ কমাতে সহায়তা
করে।
৭. কাঁচা তরমুজঃ তরমুজের রস পান করুন অথবা তরমুজের টুকরা করে খেতে
পারেন। তরমুজে প্রচুর পরিমাণে পানি থাকে, যা শরীরের আর্দ্রতা বজায় রাখতে
সাহায্য করে এবং তাপমাত্রা কমাতে সহায়তা করে।
৮. লেবু ও নুনঃ একটি গ্লাস ঠান্ডা পানিতে ১ চামচ লেবুর রস এবং এক
চিমটি নুন মিশিয়ে পান করুন। লেবুর সাইট্রিক অ্যাসিড এবং নুন শরীরের আর্দ্রতা
বজায় রাখতে সহায়তা করে এবং শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখে।
৯. তাজা আমলকীঃ তাজা আমলকি খেলে শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য
পেতে পারেন। আপনি এটি সরাসরি খেতে পারেন অথবা এর রস পান করতে পারেন। আমলকী
শরীরের তাপমাত্রা কমাতে এবং শরীরের জল শূন্যতা পূরণ করতে সাহায্য করে।
১০. আলমন্ড অয়েলঃ আলমন্ড অয়েল কিছু গরম পানিতে মিশিয়ে ত্বকে ম্যাসাজ
করুন। এটি ত্বককে শীতল করে এবং শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখে।
সতর্কতাঃ এইসব ঘরোয়া উপায় হালকা হিট স্ট্রোকের ক্ষেত্রে সহায়ক হতে
পারে, যদি হিট স্ট্রোকের লক্ষণ গুরুতর হয় বা অবস্থা খারাপ হতে থাকে, তাহলে
দ্রুত চিকিৎসকের সাহায্য নেওয়া উচিত। হিট স্ট্রোক একটি জীবনহানির ঝুঁকি তৈরি
করতে পারে, তাই প্রাথমিক চিকিৎসা গ্রহণের পর দ্রুত হাসপাতাল যাওয়ার ব্যবস্থা
করুন।
শেষ কথা হিট স্ট্রোক থেকে বাঁচার উপায়
হিট স্ট্রোকের যদি তাড়াতাড়ি চিকিৎসা না করা হয়, তবে এটি মস্তিষ্কের,
হৃদপিণ্ডের এবং অন্যান্য অঙ্গের ক্ষতি করতে পারে। গুরুতর ক্ষেত্রে এটি
মৃত্যুর কারণ হতে পারে। শরীরের তাপমাত্রা কমানোর জন্য যথাযথ ব্যবস্থা না
নেওয়া হলে, শরীরের কোষগুলোর ক্ষতি হতে পারে যা প্রাণঘাতী হতে পারে। তাই গরমের
সময় সতর্ক থাকা জরুরি। পর্যাপ্ত পানি পান করা, গরমে ভারী কাজ এড়িয়ে চলা এবং
ঠান্ডা পরিবেশ বজায় রাখা হিট স্ট্রোক প্রতিরোধের অন্যতম উপায়।
হিট স্ট্রোক একটি মারাত্মক অবস্থা, যা দ্রুত চিকিৎসা না নিলে প্রাণঘাতী হতে
পারে। তবে এটি প্রতিরোধ করা সম্ভব। পর্যাপ্ত পানি পান, সঠিক পোশাক এবং সচেতন
জীবনযাপন এই ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করতে পারে। গ্রীষ্মকালে সুস্থ থাকার জন্য এই
টিপস এবং প্রতিকারগুলি অনুসরণ করুন। যদি কারও হিট স্ট্রোকের লক্ষণ দেখা যায়,
তবে দ্রুত তাকে ঠান্ডা স্থানে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসা দেওয়ার ব্যবস্থা করুন। আশা
করি, হিট স্ট্রোক থেকে বাঁচার উপায় সম্পর্কে জানতে পেরেছেন।
বিডি টেকল্যান্ডের নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটা কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url