রোজা ভঙ্গের কারণ ও রোজার মাকরুহ সমূহ
রোজা ভঙ্গের কারণ ও রোজার মাকরুহ সমূহ কি কি, আমাদের মাঝে অনেকেই আছেন যারা এ
সম্পর্কে জানেন না। সুবহে সাদিক হতে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সকল প্রকার পানাহার,
পাপাচার এবং যাবতীয় ভোগ-বিলাস ও অপ্রয়োজনীয় কাজ থেকে বিরত থাকার নাম সাওম বা
রোজা। রোজা মুসলিম জাতির জন্য অনেক তাৎপর্যপূর্ন একটি ইবাদাত।
সারাবিশ্বের মুসলিম জাতি এই রমজান মাসের মাধ্যেমে আল্লাহর একত্ব স্বীকার করে,
মহান আল্লাহকে খুশি করার মাধ্যমে নিজেদের ঈমানের পরীক্ষা দিয়ে থাকে। পবিত্র
রমজান মাসে আমরা সঠিকভাবে রোজা পালন করতে চাই কিন্তু রোজা পালনের সঠিক নিয়ম বা
কি কি কারণে রোজা ভেঙে যায় সেই সম্পর্কে জানিনা।
সাধারণত আমরা অনেকেই মাঝে মাঝে রোজা ভঙ্গের কারণ সমূহ নিয়ে বিভিন্ন সময় অনেক
প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে থাকি। যেমন ধরুন, স্বপ্নদোষ হলে রোজা ভাঙ্গে? রোজা ভঙ্গের
কাফফারা, নফল রোজা ভঙ্গের কারণ, হস্তমৈথুন, মহিলাদের হায়েয এবং নিফাসের রক্ত
বের হওয়া, বমি করা ইত্যাদি বিষয়সমূহ নিয়ে।তাই চলুন জেনে নিই রোজা ভঙ্গের কারণ ও রোজার মাকরুহ সমূহ।
পোস্ট সূচিপত্রঃ রোজা ভঙ্গের কারণ ও রোজার মাকরুহ সমূহ
- রোজা ভঙ্গের কারণসমূহ-বিস্তারিত ব্যাখ্যা
- রোজা ভঙ্গ হলে করনীয়-বিস্তারিত ব্যাখ্যা
- রোজার মাকরুহ সমূহ
- রোজার কাজা ও কাফফারা কী
- রোজার কাফফারা আদায়ের নিয়ম
- যেসব কারণে রোজা না রাখলে ক্ষতি নেই তবে কাযা আদায় করতে হবে
- যেসব কারণে রোজা ভাঙে না
- রোজা রাখার উপকারিতা
- রমজান মাসের আমলসমূহ
- রমজান মাসের করণীয় ও বর্জনীয় বিষয়গুলি
- যাদের জন্য রোজা না রাখার অনুমতি রয়েছে
- রোজা সম্পর্কে প্রচলিত ভুল ধারণাসমূহ
- শেষকথাঃ রোজা ভঙ্গের কারণ ও রোজার মাকরুহ সমূহ
রোজা ভঙ্গের কারণসমূহ-বিস্তারিত ব্যাখ্যা
রোজা ভঙ্গের কারণসমূহ হয়তো অনেকে নাও জেনে থাকবে। রোজা ইসলাম ধর্মের গুরুত্বপূর্ণ একটি ইবাদত, যা সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত
পর্যন্ত পানাহার ও অন্যান্য কিছু বিষয় থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে পালন করা হয়। যদি
কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে রোজা ভাঙে, তাহলে তাকে কঠোর কাফফারা দিতে হবে। ভুলক্রমে বা
অনিচ্ছাকৃতভাবে কিছু খেলে, পান করলে বা বিশেষ কিছু ঘটলে রোজা ভাঙবে না। তবে কিছু
কারণ রোজা ভঙ্গ করে, যার বিস্তারিত ব্যাখ্যা নিম্নে দেওয়া হলো।
১. ইচ্ছাকৃতভাবে কিছু খাওয়া বা পান করাঃ রোজা রাখা অবস্থায় কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো খাবার বা পানীয় খেলে রোজা ভেঙে যাবে। ভুলক্রমে বা অনিচ্ছাকৃতভাবে খেলে রোজা ভাঙবে না (হাদিসে বলা হয়েছে, এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে রিজিক)। তবে মনে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে খাওয়া বন্ধ করতে হবে।
যা খেলে রোজা ভাঙবেঃ
- খাবার ও পানীয়
- ওষুধ (ট্যাবলেট, সিরাপ ইত্যাদি)
- ধূমপান (সিগারেট, বিড়ি, হুক্কা, গাঁজা, ভেপ ইত্যাদি)
- শরীরে প্রবেশযোগ্য কোনো পুষ্টিকর ইনজেকশন
- অনিচ্ছাকৃতভাবে কিছু খেলে বা পান করলে
- মিসওয়াক করা বা দাঁত পরিষ্কার করা (যদি মিসওয়াক বা টুথপেস্ট গিলে না ফেলা হয়)
- গলার ভেতরে ধুলাবালি, ধোঁয়া বা মশা-মাছি প্রবেশ করলে
২. ইচ্ছাকৃতভাবে বীর্যপাত ঘটানোঃ ইচ্ছাকৃতভাবে হস্তমৈথুন, কু-চিন্তা করা,
অশ্লীল কিছু দেখা বা শরীরের সঙ্গে ঘষাঘষির মাধ্যমে বীর্যপাত ঘটালে রোজা ভেঙে
যাবে। যদি রাতে সহবাস করা হয় এবং সুবহে সাদিকের পর গোসল করা হয়, তবে রোজা ভাঙবে
না। স্বপ্নদোষ বা ঘুমের মধ্যে বীর্যপাত হলে রোজা ভাঙবে না।
৩. স্বামী-স্ত্রীর সহবাস বা সম্পর্ক স্থাপন করাঃ রোজা
অবস্থায় ইচ্ছাকৃতভাবে সহবাস করলে রোজা ভেঙে যাবে এবং কাফফারা (শাস্তি) দিতে
হবে। কাফফারা হলো ৬০ দিন রোজা রাখা অথবা ৬০ জন গরিবকে
খাওয়ানো। যদি সহবাস না করে শুধু চুম্বন বা আলিঙ্গন করা হয়:যদি এতে বীর্যপাত না
ঘটে, তাহলে রোজা ভাঙবে না।
৪. ইচ্ছাকৃতভাবে বমি করাঃ যদি কেউ নিজে থেকে আঙুল ঢুকিয়ে বা ওষুধ খেয়ে
ইচ্ছাকৃতভাবে বমি করে, তাহলে রোজা ভেঙে যাবে। তবে যদি স্বাভাবিকভাবে বা
অসুস্থতার কারণে বমি হয়, তাহলে রোজা ভাঙবে না।
৫. নারীদের ঋতুস্রাব (মাসিক) ও প্রসবজনিত রক্তস্রাঃ বযদি রোজা থাকা
অবস্থায় নারীর ঋতুস্রাব শুরু হয়, তাহলে তার রোজা ভেঙে যাবে, এমনকি দিনের
একেবারে শেষ মুহূর্তেও হলে। সন্তান জন্মের পরের রক্তস্রাব (নিফাস) থাকলেও রোজা
রাখা যাবে না।পরে কাজা রোজা রাখতে হবে।
৬. নাক বা কানে ওষুধ প্রবেশ করানোঃ যদি নাকে এমন কোনো ওষুধ বা পানীয়
প্রবেশ করানো হয় যা পাকস্থলীতে পৌঁছে, তাহলে রোজা ভেঙে যাবে। কানে পানির
পরিবর্তে কোনো ওষুধ বা ড্রপ ব্যবহার করলে রোজা ভেঙে যাবে।চোখের ড্রপ বা কান
পরিষ্কারের জন্য পানি ব্যবহার করলে রোজা ভাঙবে না।
৭. ইনজেকশন বা স্যালাইন গ্রহণ করাঃ যদি কোনো পুষ্টিকর ইনজেকশন বা
স্যালাইন নেওয়া হয়, তাহলে রোজা ভেঙে যাবে। তবে ব্যথানাশক ইনজেকশন বা ইনসুলিন
নিলে রোজা ভাঙবে না।
৮. ধূমপান বা অন্য কোনো নেশাদ্রব্য গ্রহণ করাঃ ধূমপান, গাঁজা, ইয়াবা,
হেরোইন ইত্যাদি গ্রহণ করলে রোজা ভেঙে যাবে। এগুলো পাকস্থলীতে প্রবেশ করে এবং
শরীরে প্রভাব ফেলে।
৯. পানি বা অন্য কিছু গলা পর্যন্ত পৌঁছানোঃ অজু করার সময় যদি
অসাবধানতাবশত পানি গলার ভেতরে চলে যায়, তাহলে রোজা ভেঙে যাবে। তবে যদি সম্পূর্ণ
অনিচ্ছাকৃতভাবে কিছু গিলে ফেলা হয় এবং সেটি নিজের নিয়ন্ত্রণে না থাকে, তাহলে
রোজা ভাঙবে না।
১০. এমন কিছু যা পানাহারের স্থলাভিষিক্তঃ পানাহারের স্থলাভিষিক্ত
বলতে এমন বিষয়কে বোঝানো হয়, যা পানাহারের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
এটি ২টি বিষয়কে অন্তর্ভুক্ত করে যেমনঃ
- রোজাদারের শরীরে রক্ত পুশ করা। আহত হয়ে রক্তক্ষরণের কারণে কারও শরীরে যদি রক্ত পুশ করানো হয় তাহলে সেই ব্যক্তির রোযা ভেঙ্গে যাবে। যদি কোনো রোজাদার ব্যক্তি এই ধরনের কাজ করে তবে তার রোজা ভেঙ্গে যাবে। তাই এই সমস্ত বেপার অত্যান্ত সতর্ক থাকতে হবে রোজাদার ব্যক্তিদের।
- অপরদিকে খাদ্যের বিকল্প হিসেবে ইনজেকশন পুশ করা অর্থাৎ শরীরের ক্লান্তি দূর করার জন্য স্যালাইন নেওয়া ইত্যাদি। যদি কোনো রোজাদার ব্যক্তি এমন করে তবে তার রোজা ভেঙ্গে যাবে। কেননা এমন ইনজেকশন নিলে পানাহারের প্রয়োজন হয়না।
১১. শিঙ্গা লাগানো বা এমন কোনো কাজ করার কারণে রক্ত বাহির করাঃ যদি কোন রোজাদার ব্যক্তি হিজামা বা শিঙ্গা লাগানোর মতো কোন কাজ করে
এবং সেই রোজাদার ব্যক্তির শরীর থেকে রক্ত বাহির করা হয় তবে উক্ত রোজাদার
ব্যক্তির রোজা নষ্ট হয়ে যাবে। আমাদের প্রিয় নবী হজরত মোহাম্মদ (সাঃ) ইরশাদ
করেনঃ যে ব্যক্তি শিঙ্গা লাগায় ও যার শিঙ্গা লাগানো হয় উভয়ের রোযা ভেঙ্গে
যাবে। সুনানে আবু দাউদ (২৩৬৭), আলবানী সহিহ আবু দাউদ গ্রন্থে (২০৪৭)
হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন।
রোজা ভঙ্গ হলে করণীয়–বিস্তারিত ব্যাখ্যা
রোজা ভঙ্গ হলে করণীয় নির্ভর করে রোজা ভঙ্গের কারণের ওপর। যদি বৈধ কারণে রোজা
ভেঙে যায় তাহলে শুধু কাজা করতে হবে। কিন্তু যদি ইচ্ছাকৃতভাবে রোজা ভঙ্গ করা
হয়, তাহলে কাফফারা দিতে হবে। মুসলমানদের উচিত রমজানের পবিত্রতা রক্ষা করা এবং
অকারণে রোজা ভঙ্গ না করা। রমজান মাসের রোজা ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ
ইবাদত। তবে কিছু কারণবশত রোজা ভেঙে যেতে পারে। নিচে রোজা ভঙ্গের কারণ, করণীয়র
বিস্তারিত ব্যাখ্যা করা হলো।
আরও পড়ুনঃ শবে বরাতের নামাযের নিয়ম ও দোয়া
১. রোজা ভঙ্গের কারণসমূহঃ রোজা ভঙ্গের কারণগুলো প্রধানত দুই প্রকার,
যেমনঃ- যেসব কারণে রোজা ভঙ্গ হয়, কিন্তু কাফফারা দিতে হয় না।
- যেসব কারণে রোজা ভঙ্গ হলে কাজা ও কাফফারা দুটোই দিতে হয়।
১.১ যেসব কারণে রোজা ভঙ্গ হয়, কিন্তু কাফফারা দিতে হয় নাঃ নিম্নোক্ত
কারণগুলোর কারণে রোজা ভেঙে গেলে শুধু পরে একদিন রোজা কাজা রাখতে হবে, কাফফারা
দিতে হবে না।
অনিচ্ছাকৃতভাবে ভুল করে কিছু খাওয়া বা পান করাঃ যদি কেউ ভুলবশত
পানাহার করে ফেলে এবং পরে মনে পড়ে যে সে রোজা রেখেছে, তাহলে সঙ্গে সঙ্গে
খাওয়া বন্ধ করে দিতে হবে এবং রোজা চালিয়ে যেতে হবে। এই অবস্থায় রোজা নষ্ট হবে
না এবং কাজাও রাখতে হবে না।
অসুস্থতার কারণে রোজা ভেঙে ফেলাঃ যদি কেউ গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ে এবং
রোজা রাখলে অসুস্থতা বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে, তাহলে সে রোজা ভেঙে ফেলতে
পারে। পরে সুস্থ হলে একদিনের রোজার কাজা রাখতে হবে।
ভ্রমণের কারণে রোজা ভেঙে ফেলাঃ যদি কেউ সফরে (প্রায় ৭৮ কিলোমিটার বা
তার বেশি দূরত্বে) থাকে এবং রোজা রাখা কষ্টকর হয়, তাহলে সে রোজা ভেঙে ফেলতে
পারে। পরে সেই রোজার কাজা আদায় করতে হবে।
গর্ভবতী বা স্তন্যদানকারী মাঃ যদি গর্ভবতী বা স্তন্যদানকারী মা মনে
করেন যে রোজা রাখলে তার নিজের বা শিশুর ক্ষতি হতে পারে, তাহলে তিনি রোজা না
রেখে পরে কাজা আদায় করতে পারেন। যদি তারা দীর্ঘমেয়াদে রোজা রাখতে অক্ষম হন,
তাহলে ফিদিয়া দিতে হবে (প্রতি রোজার জন্য একজন গরিবকে খাওয়ানো)।
অনিচ্ছাকৃতভাবে বমি করাঃ যদি কেউ স্বাভাবিকভাবে বমি করে, তাহলে রোজা
ভঙ্গ হবে না। তবে যদি ইচ্ছাকৃতভাবে আঙুল দিয়ে বা অন্যভাবে বমি বের করা হয় এবং
তা পুরো মুখভর্তি হয়, তাহলে রোজা ভেঙে যাবে, তবে কাফফারা লাগবে না—শুধু কাজা
করতে হবে।
নাকে বা কানে ওষুধ ব্যবহার করাঃ যদি কোনো ওষুধ বা পানি নাক দিয়ে
সরাসরি পাকস্থলীতে চলে যায়, তাহলে রোজা ভেঙে যাবে এবং পরে কাজা করতে হবে।
১.২ যেসব কারণে কাজা ও কাফফারা দুটোই দিতে হয়ঃ নিম্নলিখিত কাজগুলো
করলে রোজা ভঙ্গ হবে এবং শুধুমাত্র কাজা করলেই চলবে না, বরং কাফফারাও আদায়
করতে হবে।
ইচ্ছাকৃতভাবে খাবার বা পানীয় গ্রহণ করাঃ কেউ যদি ইচ্ছাকৃতভাবে (ভুলে
নয়) খাওয়া-দাওয়া করে, তাহলে তার রোজা ভেঙে যাবে এবং তাকে ৬০ দিন একটানা রোজা
রাখতে হবে (কাফফারা) অথবা ৬০ জন গরিবকে খাওয়াতে হবে।
ইচ্ছাকৃতভাবে সহবাস করাঃ রোজা থাকা অবস্থায় যদি কেউ স্বামী-স্ত্রী
সহবাস করে, তাহলে তার রোজা ভঙ্গ হবে এবং কাফফারা দিতে হবে।
ইচ্ছাকৃতভাবে হস্তমৈথুন করাঃ যদি কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে হস্তমৈথুন করে এবং
বীর্যপাত হয়, তাহলে তার রোজা ভঙ্গ হয়ে যাবে এবং তাকে কাফফারা দিতে হবে।
রোজা ভঙ্গের কারণ | করণীয় |
---|---|
অনিচ্ছাকৃতভাবে ভুলে কিছু খাওয়া | রোজা ভাঙেনি, চালিয়ে যেতে হবে |
অসুস্থতার কারণে রোজা ভেঙে ফেলা | পরে শুধু কাজা রাখা |
ভ্রমণের কারণে রোজা ভাঙা | পরে শুধু কাজা রাখা |
গর্ভবতী বা স্তন্যদানকারী মা রোজা ভাঙলে | পরে শুধু কাজা রাখা (অক্ষম হলে ফিদিয়া) |
ইচ্ছাকৃতভাবে খাবার বা পানীয় গ্রহণ করা | কাজা + ৬০ দিন রোজা (বা ৬০ জনকে খাওয়ানো) |
ইচ্ছাকৃতভাবে সহবাস করা | কাজা + ৬০ দিন রোজা (বা ৬০ জনকে খাওয়ানো) |
ইচ্ছাকৃতভাবে হস্তমৈথুন করা | কাজা + ৬০ দিন রোজা (বা ৬০ জনকে খাওয়ানো) |
৩. কাফফারার বিস্তারিত নিয়মঃ যদি কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে রোজা ভঙ্গ করে এবং
কাফফারা দিতে হয়, তাহলে তিনটি বিকল্পের একটিতে পালন করতে হবেঃ
- ৬০ দিন একটানা রোজা রাখাঃ যদি কেউ মাঝখানে রোজা ভেঙে ফেলে, তাহলে আবার নতুন করে ৬০ দিন শুরু করতে হবে।
- ৬০ জন গরিব মানুষকে খাওয়ানোঃ যদি কেউ অসুস্থতার কারণে রোজা রাখতে না পারে, তাহলে ৬০ জন গরিবকে খাওয়াতে হবে। প্রত্যেক গরিবকে এক বেলার পূর্ণ খাবার দিতে হবে।
৪. তওবা ও ইস্তিগফার করাঃ যদি কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে রোজা ভেঙে ফেলে, তবে
তাকে আন্তরিকভাবে তওবা করতে হবে এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে হবে।
রোজার মাকরুহ সমূহ
রোজার মাকরুহ সমূহগুলো মূলত রোজার পবিত্রতা ও সওয়াব কমিয়ে দেয়। তাই রোজা
রাখার সময় এসব কাজ থেকে বিরত থাকা উচিত। রোজার উদ্দেশ্য শুধু না খেয়ে থাকা
নয়, বরং নিজেকে যাবতীয় খারাপ কাজ থেকে বিরত রাখা এবং আত্মশুদ্ধি অর্জন করা।
তবে কিছু কাজ রোজার সওয়াব কমিয়ে দেয়, যেগুলোকে ইসলামিক পরিভাষায় "মাকরুহ"
বলা হয়। মাকরুহ কাজগুলো করলে রোজা ভাঙে না, তবে তা রোজার মূল চেতনা ও সওয়াব
নষ্ট করতে পারে।
আরও পড়ুনঃ শবে কদরের নামাজের নিয়ম ও দোয়া
রোজা ভঙ্গের কারণ ও রোজার মাকরুহ সমূহ হলোঃ
১. বিনা প্রয়োজনে কুলি করা বা নাকে পানি দেওয়াঃ রোজার মধ্যে
মুখে পানি নেওয়া এবং নাকে পানি দেওয়া জায়েজ, তবে অযথা বেশি করা মাকরুহ।কারণ
এতে পানি গলায় চলে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে, যা রোজা ভঙ্গের কারণ হতে পারে।
বিশেষত ওজুর সময় নাকে বেশি পরিমাণ পানি টানা যাবে না।
হাদিসঃ রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ওজু করার সময় নাকে ভালোভাবে
পানি প্রবেশ করাও, তবে রোজাদারের ক্ষেত্রে তা কম করবে। (সুনান আবু দাউদ:
২৩৬৬)
২. খাবারের স্বাদ চেখে দেখাঃ কোনো প্রয়োজনে রান্নার স্বাদ
দেখতে হলে জিভে লাগিয়ে সঙ্গে সঙ্গে ফেলে দিতে হবে। তবে বারবার স্বাদ দেখা
বা অপ্রয়োজনে তা করা মাকরুহ। কারণ এতে গিলে ফেলার আশঙ্কা থাকে, যা রোজা
ভেঙে দিতে পারে।
ফিকহবিদগণ বলেনঃ রোজাদার ব্যক্তির জন্য খাবারের স্বাদ দেখা
মাকরুহ, তবে যদি প্রয়োজন হয় (যেমন রান্নার স্বাদ পরীক্ষা করা), তবে গিলে না
ফেললে সমস্যা নেই। (ফাতাওয়া হিন্দিয়া: ১/২০০)
৩. থুথু, কফ বা নাকের ময়লা গিলে ফেলাঃ স্বাভাবিকভাবে মুখের
লালা গিলে ফেলা মাকরুহ নয়। কিন্তু ইচ্ছাকৃতভাবে থুথু, কফ বা নাকের ময়লা
গিলে ফেলা মাকরুহ। কারণ এটি রোজার পবিত্রতা ক্ষুণ্ণ করে।
ফিকহবিদদের মতঃ নিজের কফ বা নাকের ময়লা মুখে নিয়ে গেলে এবং তা
গিলে ফেললে রোজার সওয়াব কমে যাবে, যদিও তা রোজা ভাঙার কারণ হবে না। (রদ্দুল
মুহতার: ২/৪০৫)
৪. দাঁতে আটকে থাকা খাবার গিলে ফেলাঃ দাঁতে আটকে থাকা খাবার
যদি ছোট হয়, তাহলে গিলে ফেললে রোজা ভাঙবে না। কিন্তু যদি বড় হয় এবং
ইচ্ছাকৃতভাবে গিলে ফেলা হয়, তবে রোজা ভেঙে যাবে। দাঁত পরিষ্কার না করলে
সেখান থেকে খাবার পেটে চলে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে, যা রোজার সওয়াব নষ্ট করতে
পারে।
ফিকহবিদদের মতেঃ যদি কেউ দাঁতে আটকে থাকা খাদ্য ইচ্ছাকৃতভাবে
গিলে ফেলে, তবে এটি মাকরুহ। কিন্তু যদি সেটি বড় হয়, তবে রোজা ভেঙে যাবে।
(বাহরুর রায়েক: ২/২৭৩)
৫. বেশি পরিমাণে তেল, সুরমা বা কোনো প্রসাধনী ব্যবহার করাঃ রোজার সময় চোখে সুরমা, তেল বা কোনো প্রসাধনী ব্যবহার করা জায়েজ। তবে
যদি তা অতিরিক্ত হয় বা মুখ ও নাকের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশের সম্ভাবনা থাকে,
তবে মাকরুহ। সুরমা ব্যবহারে রোজা ভাঙবে না, তবে সওয়াব কমতে পারে।
ইসলামিক মতঃ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন: রোজাদার ব্যক্তি সুরমা
ব্যবহার করতে পারে, তবে এটি থেকে দূরে থাকাই উত্তম। (মুসান্নাফ আবদুর
রাজ্জাক: ৪/২০৭)
৬. রাগ করা, ঝগড়া-বিবাদ করা বা অশ্লীল কথা বলাঃ রোজার সময়
ধৈর্য ও সংযম বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঝগড়া, গালাগালি বা কারো
সঙ্গে খারাপ আচরণ করা মাকরুহ। কারণ রোজার আসল উদ্দেশ্য হচ্ছে আত্মশুদ্ধি ও
চরিত্র গঠন।
হাদিসঃ রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি মিথ্যা বলা এবং
মন্দ কাজ পরিত্যাগ করতে পারল না, তার খালি উপোস থাকার কোনো মূল্য নেই।
(সহিহ বুখারি: ১৯০৩)
৭. ধূপ, আগরবাতি বা ধোঁয়া ইচ্ছাকৃতভাবে গ্রহণ করাঃ ধূপ,
আগরবাতি বা ধোঁয়া ইচ্ছাকৃতভাবে গ্রহণ করলে তা মাকরুহ। কারণ এতে
ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কণা নাক বা মুখ দিয়ে শরীরে প্রবেশ করতে পারে।
ফতোয়াঃ ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) বলেন, রোজাদার যদি ইচ্ছাকৃতভাবে
ধোঁয়া গ্রহণ করে, তবে এটি মাকরুহ। (রদ্দুল মুহতার: ২/৩৯৫)
৮. বেশি পরিমাণ রক্ত বের করা বা দান করাঃ শরীর থেকে অতিরিক্ত
রক্ত বের হলে দুর্বলতা আসতে পারে, যা রোজার কষ্ট বৃদ্ধি করবে। হিজামা
(শিঙ্গা লাগানো) বা রক্তদান করা মাকরুহ যদি তা শারীরিক দুর্বলতা সৃষ্টি
করে।
হাদিসঃ রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, রোজাদার ব্যক্তি হিজামা
(শিঙ্গা) করলে তার রোজা মাকরুহ হয়ে যাবে। (আবু দাউদ: ২৩৬৮)
৯. মুখে পান রেখে দীর্ঘক্ষণ ঘুরানোঃ রোজাদারের জন্য পানি দিয়ে
কুলি করা জায়েজ, তবে পান মুখে রেখে বেশি সময় ঘোরানো মাকরুহ। কারণ এতে গলায়
চলে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
ফতোয়াঃ ফিকহবিদগণ বলেন, যদি রোজাদার ব্যক্তি পান মুখে নিয়ে
দীর্ঘক্ষণ রাখে, তবে এটি মাকরুহ। (ফাতাওয়া শামি: ২/৩৫২)। আশা করছি রোজা ভঙ্গের কারণ ও রোজার মাকরুহ সমূহ সম্পর্কে জানতে পেরেছেন।
রোজার কাজা ও কাফফারা কি
রোজার কাজা ও কাফফারা ইসলামি শরিয়তে রোজা ভঙ্গ বা ছেড়ে দেওয়ার
পরিপ্রেক্ষিতে আদায় করার নির্দিষ্ট বিধান। এগুলো মূলত রোজার ঘাটতি পূরণ বা
ভুলের ক্ষতিপূরণ হিসেবে গণ্য হয়। রোজা ভাঙার কারণ ও পরিস্থিতির ওপর নির্ভর
করে কাজা বা কাফফারা দিতে হয়। যদি রোজা ভুলক্রমে ভেঙে যায় বা কোনো
বাধ্যতামূলক কারণ থাকে, তবে শুধু কাজা যথেষ্ট। কিন্তু ইচ্ছাকৃতভাবে ভাঙলে
কাফফারা দিতে হবে। রোজার কাজা ও কাফফারা সম্পর্কে সংক্ষেপে ব্যাখ্যা দেওয়া
হলোঃ
১. রোজার কাজাঃ যদি কেউ বৈধ বা অবৈধ কোনো কারণে রোজা না রাখে বা
ভেঙে ফেলে, তবে পরবর্তী সময়ে তা আদায় করতে হয়, একে কাজা বলে।
কখন কাজা হয়ঃ
- অসুস্থতা বা ভ্রমণের কারণে রোজা ভাঙলে
- মহিলাদের হায়েজ-নেফাস হলে
- অনিচ্ছাকৃতভাবে বমি এলে এবং রোজা ভেঙে গেলে
- ভুলে কিছু খেয়ে ফেলে, পরে মনে পড়ার পর ইচ্ছাকৃতভাবে খেলে
- শরিয়তসম্মত কোনো ওজরে রোজা রাখতে না পারলে
কাজা আদায়ের নিয়মঃ
- কাজা হয়ে যাওয়া প্রতিটি রোজার জন্য পরবর্তী সময়ে শুধু একটি রোজা রাখলেই হবে।
২. রোজার কাফফারাঃ যদি কেউ রমজান মাসে ইচ্ছাকৃতভাবে রোজা ভেঙে
ফেলে (যেমন: খাওয়া, পান করা বা স্ত্রী সহবাস করা), তাহলে শুধু কাজা করলেই
চলবে না, কাফফারাও দিতে হবে।
কাফফারার বিধানঃ
- একাধারে ৬০ দিন রোজা রাখা, অথবা।
- ৬০ জন গরিবকে খাবার খাওয়ানো।
যখন কাফফারা দিতে হয়ঃ
- ইচ্ছাকৃতভাবে রোজা ভেঙে ফেলার ক্ষেত্রে।
- বিনা ওজরে রোজা রেখে খাওয়া বা পান করলে।
মনে রাখবেনঃ
- অসুস্থতা, ভুলবশত খাওয়া বা হায়েজ-নেফাসের কারণে রোজা ভাঙলে কাফফারা দিতে হয় না, শুধু কাজা করতে হয়।
- কাফফারার জন্য একবারে ৬০ দিন রোজা রাখতে হবে, মাঝে কোনো বিরতি দেওয়া যাবে না।
রোজার কাফফারা আদায়ের নিয়ম
রোজার কাফফারা আদায়ের নিয়ম হলো, যদি কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে রোজা ভেঙে দেয়
(যেমন, খাওয়া, পান করা বা অন্য কোনো যৌন আচরণ করা) তবে কাফফারা দিতে হবে।
কাফফারা তখনি বাধ্যতামূলক, যখন রোজা ভাঙার কারণে পাপ হয়। এবং তার রোজা
কাফফারা দেওয়া জরুরি হয়, তাহলে তাকে কাফফারা হিসেবে কিছু করণীয় পালন
করতে হবে। কাফফারা সাধারণত দুটি উপায়ে আদায় করা যেতে পারেঃ
১ রোজা রাখাঃ যদি রোজা ইচ্ছাকৃতভাবে ভঙ্গ করা হয়, তবে কাফফারা
হিসেবে ৬০টি রোজা রাখতে হবে। এতে ৬০টি দিন ধরে রোজা পালন করতে হবে এবং কোনও
দিন ভঙ্গ করা যাবে না। এই শর্তে দুইটি পরপর রোজা রাখতে হবে, এবং
ইচ্ছাকৃতভাবে ভাঙা যাবে না।
২ গরীবদের খাবার খাওয়ানোঃ যদি কারো জন্য রোজা রাখা সম্ভব না হয়,
তাহলে কাফফারা হিসেবে ৬০ জন গরীবকে খাবার খাওয়ানো হতে পারে। প্রতিটি
গরীবকে এমন একটি খাবার প্রদান করতে হবে, যা সাধারণত মুসলমানদের জন্য খাদ্য
হিসেবে গ্রহণযোগ্য। একবার খাবার খাওয়াতে হবে।
কাফফারা না দিতে পারলে কি হবেঃ
- যদি কেউ কাফফারা আদায় করার জন্য শারীরিক বা আর্থিকভাবে অক্ষম থাকে, তবে তাকে তাওবা করতে হবে এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতে হবে।
যদি ইচ্ছাকৃত না হয়ঃ
- যদি রোজা ভাঙা কোনো অনিচ্ছাকৃত কারণে হয়ে থাকে (যেমন ভুলে খেয়ে ফেলা বা পান করা), তবে এতে কোনো কাফফারা দেয়ার প্রয়োজন হয় না। তবে সেই দিনে রোজা আবার সম্পন্ন করা হবে এবং পরবর্তীতে এটি শুধরে নেওয়া যাবে।
ইবরাহীম নাখায়ী রাহ. বলেন, ‘যার উপর কাফফারা হিসাবে দুই মাস ধারাবাহিকভাবে
রোযা রাখা জরুরি সে যদি মাঝে অসুস্থ হওয়ার কারণে রোযা রাখতে না পারে,
তাহলে আবার নতুন করে রোযা রাখা শুরু করবে।’-আলমুহাল্লা ৪/৩৩১; মাবসূত,
সারাখসী ৭/১৪; আলবাহরুর রায়েক ২/২৭৭; আলমুহীতুল বুরহানী ৫/১৯৬
যেসব কারণে রোজা না রাখলে ক্ষতি নেই তবে কাযা আদায় করতে হবে
রমজান মাসে রোজা রাখা প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক ও সুস্থ মুসলমানের জন্য ফরজ। তবে
ইসলামে কিছু কারণ রয়েছে, যেগুলোর কারণে কেউ রোজা না রাখলে গুনাহ হবে না, কিন্তু
পরবর্তী সময়ে সেই রোজাগুলোর কাযা (বদলি রোজা) আদায় করতে হবে। ইসলামে রোজা ফরজ
হলেও কিছু বিশেষ পরিস্থিতিতে রোজা না রাখার অনুমতি দেওয়া হয়েছে যাতে কোনো
মুসলমানের কষ্ট না হয়। নিচে এসব কারণ বিস্তারিত আলোচনা করা হলোঃ
- কোনো অসুখের কারণে রোযা রাখার শক্তি হারিয়ে ফেললে অথবা অসুখ বৃদ্ধির ভয় হলে। তবে পরে তা কাযা করতে হবে।
- গর্ভবতী স্ত্রী লোকের সন্তান বা নিজের প্রাণ নাশের আশঙ্কা হলে রোজা ভঙ্গ করা বৈধ তবে কাযাকৃত রোজা পরে করে নিতে হবে।
- যেসব স্ত্রী লোক নিজের বা অপরের সন্তানকে দুধ পান করান রোজা রাখার ফলে যদি দুধ না আসে তবে রোজা না রাখার অনুমতি আছে কিন্তু পরে কাযা আদায় করতে হবে।
- শরিয়তসম্মত মুসাফির অবস্থায় রোযা না রাখার অনুমতি আছে। তবে রাখাই উত্তম।
- কেউ হত্যার হুমকি দিলে রোযা ভঙ্গের অনুমতি আছে। পরে এর কাযা করতে হবে।
- কোনো রোগীর ক্ষুধা বা পিপাসা এমন পর্যায়ে চলে গেল এবং কোনো দ্বীনদার মুসলিম চিকিৎসকের মতে রোজা ভঙ্গ না করলে তখন মৃত্যুর আশঙ্কা আছে। তবে রোযা ভঙ্গ করা ওয়াজিব। পরে তা কাযা করতে হবে।
- হায়েজ-নেফাসগ্রস্ত (বিশেষ সময়ে) নারীদের জন্য রোজা রাখা জায়েজ নয়। পরবর্তীতে কাযা করতে হবে।
যেসব কারণে রোজা ভাঙে না
এমন কিছু কারণ আছে যেসব কারণে রোজা ভাঙে না বা যার দ্বারা রোজার কোনো ক্ষতি হয় না। অথচ অনেকে এগুলোকে রোজা ভঙ্গের
কারণ মনে করে। ফলে এমন কোনো কাজ হয়ে গেলে রোজা ভেঙে গেছে মনে করে ইচ্ছাকৃত
পানাহার করে। পক্ষান্তরে কেউ কেউ এসব কাজ পরিহার করতে গিয়ে অযথা কষ্ট ভোগ
করে। সুতরাং এসব বিষয়েও সকল রোজাদার অবগত হওয়া জরুরি। চলুন দেখে নেওয়া যাক
কি সেই সব কারণ, যেসব কারণে রোজা ভাঙে না।
১. কোনো রোযাদার রোযার কথা ভুলে গিয়ে পানাহার করলে তার রোযা নষ্ট হবে না।
তবে রোযা স্মরণ হওয়ামাত্রই পানাহার ছেড়ে দিতে হবে। হাদীস শরীফে এসেছে-
من نسي وهو صائم فأكل أو شرب فليتم صومه، فإنما أطمعه الله وسقاه.
‘যে ব্যক্তি ভুলে আহার করল বা পান করল সে যেন তার রোযা পূর্ণ করে। কারণ
আল্লাহই তাকে পানাহার করিয়েছেন।’-সহীহ মুসলিম ১/২০২; আলবাহরুর রায়েক ২/২৭১;
ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/২০২
২. চোখে ওষুধ-সুরমা ইত্যাদি লাগালে রোযার কোনো ক্ষতি হয় না। আনাস রা. রোযা
অবস্থায় সুরমা ব্যবহার করতেন।-সুনানে আবু দাউদ ১/৩২৩; ফাতাওয়া হিন্দিয়া
১/২০৩; রদ্দুল মুহতার ২/৩৯৫
৩. রাত্রে স্ত্রীসহবাস করলে বা স্বপ্নদোষ হলে সুবহে সাদিকের আগে গোসল করতে না
পারলেও রোযার কোনো ক্ষতি হবে না। তবে কোনো ওযর ছাড়া, বিশেষত রোযার হালতে
দীর্ঘ সময় অপবিত্র থাকা অনুচিত। আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, গোসল
ফরয অবস্থায় নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সকাল হত। অতঃপর
তিনি গোসল করে রোযা পূর্ণ করতেন।
৪. বীর্যপাত ঘটা বা সহবাসে লিপ্ত হওয়ার আশঙ্কা না থাকলে স্ত্রীকে চুমু
খাওয়া জায়েয। তবে কামভাবের সাথে চুমু খাওয়া যাবে না। আর তরুণদের যেহেতু এ
আশঙ্কা থাকে তাই তাদের বেঁচে থাকা উচিত।
৫. অনিচ্ছাকৃত বমি হলে (মুখ ভরে হলেও) রোযা ভাঙ্গবে না। তেমনি বমি মুখে এসে
নিজে নিজে ভেতরে চলে গেলেও রোযা ভাঙ্গবে না। হাদীস শরীফে আছে, অর্থঃ
অনিচ্ছাকৃতভাবে কোনো ব্যক্তির বমি হলে তার রোযা কাযা করতে হবে না।-জামে
তিরমিযী ১/১৫৩, হাদীস : ৭২০; আলবাহরুর রায়েক ২/২৭৪; রদ্দুল মুহতার ২/৪১৪
৬. শরীর বা মাথায় তেল ব্যবহার করলে রোযা ভাঙ্গবে না। কাতাদাহ রাহ.
বলেন, ‘রোযাদারের তেল ব্যবহার করা উচিত, যাতে রোযার কারণে সৃষ্ট ফ্যাকাশে
বর্ণ দূর হয়ে যায়।-মুসান্নাফে আবদুর রাযযাক ৪/৩১৩; আদ্দুররুল মুখতার ২/৩৯৫;
আলবাহরুর রায়েক ২/১৭৩
রোজা রাখার উপকারিতা
রোজা রাখার উপকারিতা রয়েছে অনেক। রোজা শুধু ধর্মীয় ইবাদত বা আত্মিক
প্রশান্তির জন্য নয়, এটি শরীর ও মনেও এক অদ্ভুত প্রশান্তি ও সুস্থতার দিকে
নিয়ে যায়। রমজানের একটি বিশেষ ফজিলত বা মাহাত্ম্য হচ্ছে,এই পবিত্র রমজান
মাসে আল কোরআন অবতীর্ণ হয়েছে। রমজান মাসের রোজা মানুষকে পাপ-পঙ্কিলতা থেকে
মুক্তি দেয়,মানুষের কুপ্রবৃত্তি ধুয়ে মুছে দেয় এবং আত্মাকে দহন করে
ঈমানের শাখা প্রশাখা সঞ্জিবীত করে।
রোজার মাধ্যমে মানুষের শারীরিক, মানসিক, নৈতিক এবং সামাজিক গুণাবলি বৃদ্ধি
পায়, যা সবার জন্য একটি উপকারিতা। সর্বোপরি আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের নৈকট্য
ও সন্তুষ্টি লাভ করা যায়। এই মর্মে মহানবী ইরশাদ করেছেন, রোজাদারের জন্য
দুটি খুশি। একটি হলো তার ইফতারের সময়, আর অপরটি হলো আল্লাহর সঙ্গে
সাক্ষাতের সময়। নিচে রোজার কিছু গুরুত্বপূর্ণ উপকারিতা তুলে ধরা হলোঃ
১. শারীরিক উপকারিতা
হজম প্রক্রিয়ার উন্নতিঃ রোজার সময় দীর্ঘক্ষণ খাবার থেকে বিরত
থাকার কারণে পাচনতন্ত্র বিশ্রাম পায়, যার ফলে হজম প্রক্রিয়া আরও কার্যকরী
হয়। দিনের অন্যান্য সময় খাদ্য গ্রহণের মাধ্যমে শরীর অতিরিক্ত পরিমাণে
ক্যালোরি গ্রহণ করতে পারে, কিন্তু রোজা রাখলে তা হ্রাস পায়। শরীর খাওয়ার
জন্য চাপ অনুভব না করে, খাবারের প্রতি আগ্রহ কমে যায় এবং শরীরের ডাইজেস্টিভ
সিস্টেম রিফ্রেশ হয়।
ওজন কমাতে সহায়কঃ রোজা রাখার ফলে সাধারণত পেটের ক্ষুধা কমে
আসে, যা অতিরিক্ত খাবার গ্রহণ কমিয়ে দেয়। তাছাড়া, দীর্ঘ সময় না খাওয়ার ফলে
শরীরের অতিরিক্ত চর্বি ব্যবহৃত হতে শুরু করে, যার ফলে ওজন কমানোর প্রক্রিয়া
সহজ হয়।
ডিটক্সিফিকেশনঃ রোজা শরীরের ভেতর থেকে ক্ষতিকর টক্সিন বের করে
দিতে সহায়তা করে। খাদ্য গ্রহণের ওপর বিরতি রেখে শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ,
বিশেষ করে লিভার, কিডনি এবং পরিপাকতন্ত্র, স্বাভাবিকভাবে নিজেদের পরিষ্কার
করার প্রক্রিয়া শুরু করে।
রক্তচাপ ও হৃদরোগের ঝুঁকি কমানোঃ রোজা শরীরের কোলেস্টেরল
নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে এবং উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি কমায়। একাধিক গবেষণায়
দেখা গেছে যে, রোজা রাখার ফলে মানুষের রক্তের কোলেস্টেরলের মানের ভারসাম্য
বজায় থাকে, যা হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে সহায়ক।
ইনসুলিন সংবেদনশীলতা বাড়ানোঃ রোজা রাখা শরীরের ইনসুলিন
সংবেদনশীলতা বাড়াতে সাহায্য করে। এতে রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে
থাকে, ফলে ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমে।
২. মানসিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের উপকারিতা
স্ট্রেস ও উদ্বেগ কমায়ঃ রোজার সময় খাবার থেকে বিরতি নেওয়া
মস্তিষ্কের জন্য একটি বিশ্রাম হয়ে দাঁড়ায়। এটি স্ট্রেস হরমোনের (যেমন:
কর্টিসল) নিঃসরণ কমায়, যা মানসিক চাপ ও উদ্বেগ কমায়।
মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা বৃদ্ধিঃ রোজা রাখলে মস্তিষ্কে
নিউরোট্রফিক ফ্যাক্টর (BDNF) নামে একটি প্রোটিনের মাত্রা বাড়ে। এটি
মস্তিষ্কের স্নায়ুতন্ত্রকে শক্তিশালী করে, যা স্মৃতিশক্তি এবং শিখন ক্ষমতা
বৃদ্ধি করতে সহায়ক।
একাগ্রতা ও মনোসংযোগ বৃদ্ধিঃ রোজার সময়, খাদ্য ও পানীয় থেকে
বিরতি থাকায় মানুষ সাধারণত একাগ্রতা ও মনোসংযোগে আরও ভালো হয়। অতিরিক্ত
চিন্তা থেকে মুক্তি পাওয়া এবং শারীরিক ক্ষুধার নিয়ন্ত্রণ মস্তিষ্কে আরও
দক্ষতার সাথে কাজ করতে সহায়ক হয়।
৩. আত্মিক ও নৈতিক উপকারিতা
আত্মসংযম ও ধৈর্যঃ রোজা শরীরের ক্ষুধা, তৃষ্ণা এবং অন্যান্য
প্রলোভনকে নিয়ন্ত্রণ করার প্রক্রিয়া, যা মানুষের আত্মসংযম এবং ধৈর্য গড়ে
তোলে। নিজেকে ইচ্ছাশক্তির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করার অভ্যাস জীবনের অন্যান্য
ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলে।
মানবিক গুণাবলি বৃদ্ধিঃ রোজার মাধ্যমে, ক্ষুধার কষ্ট অনুভব করে
আমরা দরিদ্র ও অভাবী মানুষের প্রতি সহানুভূতি ও দানশীলতা প্রদর্শন করি। এটি
সমাজে একতা, দয়া এবং সহমর্মিতা বাড়ায়।
খারাপ অভ্যাস পরিত্যাগঃ রোজা রাখার সময় নানা ধরনের খারাপ
অভ্যাস (যেমন: ধূমপান, মিথ্যা কথা বলা, গালিগালাজ করা) থেকে বিরত থাকা
শিখানো হয়, যা মানুষের আধ্যাত্মিক উন্নতির জন্য উপকারী।
৪. সামাজিক উপকারিতা
সামাজিক বন্ধন বৃদ্ধিঃ রোজা রাখার সময় পরিবারের সদস্যরা
একসঙ্গে ইফতার ও সেহরি করেন, যা সামাজিক সম্পর্কগুলোকে আরও দৃঢ় করে। একসাথে
খাদ্য গ্রহণ সামাজিক সুসম্পর্ক গড়ে তোলে এবং একে অপরের সাথে সম্পর্ক উন্নত
হয়।
পুনর্বিবেচনা ও আত্মমুল্যায়নঃ রোজার সময় মানুষ নিজেকে একটি
নতুন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখার সুযোগ পায়। এটি আত্মসমালোচনা, আত্মমুল্যায়ন ও
আত্মপর্যালোচনার সুযোগ দেয়।
রমজান মাসের আমলসমূহ
রমজান মাস অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ একটি মাস, যেখানে ইবাদত-বন্দেগির মাধ্যমে
আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের অপূর্ব সুযোগ রয়েছে। এ মাস হলো রহমত, মাগফিরাত ও
নাজাতের মাস। এই মাসে প্রত্যেক ভালো কাজের সওয়াব বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। তাই
রমজানের প্রতিটি মুহূর্ত ইবাদত-বন্দেগিতে কাটানো উচিত। এই মাসে কিছু বিশেষ
আমল করা হলে অনেক বেশি সওয়াব লাভ করা যায়। নিচে রমজান মাসের গুরুত্বপূর্ণ
আমলসমূহ উল্লেখ করা হলোঃ
১. রমজানের ফরজ আমলঃ রমজান মাসের ফরজ আমল হলো একটি, এক মাস
রোজা পালন করা। রমজান মাসে সিয়াম রাখা মুসলমানদের জন্য ফরজ। সিয়ামের
মাধ্যমে একজন মুসলিম আল্লাহর প্রতি তার আনুগত্য এবং আত্মসংযম প্রদর্শন করে।
রোজা রাখার সময় সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সব ধরনের খাবার, পানীয়,
ধূমপান এবং কোনো দুনিয়াবি কাজ থেকে বিরত থাকতে হয়। সূর্যাস্তের পর রোজা
খোলার জন্য ইফতার করা হয়। প্রথানুযায়ী, খেজুর দিয়ে রোজা খোলার পাশাপাশি
পানি পান করা উত্তম।
কোরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ ‘হে মুমিনগণ! তোমাদের জন্য রোজা
ফরজ করা হলো, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূববর্তীদের ওপর; যাতে করে তোমরা
মুত্তাকি হতে পারো’ (সুরা বাকারা)। প্রাপ্তবয়স্ক, স্বাভাবিক জ্ঞানসম্পন্ন,
শারীরিকভাবে রোজা পালনে সক্ষম মুসলমানের প্রতি রোজা ফরজ।
২. রমজানের ওয়াজিবসমূহঃ রমজানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ওয়াজিব দুটি,
যথাঃ সদকাতুল ফিতর আদায় করা ও ঈদের সালাত পড়া। ঈদের দিন সকালে যিনি নিসাব
পরিমাণ সম্পদের মালিক বা অধিকারী থাকবেন তিনি তার নিজের ও পরিবারের সকল
সদস্যদের ফিতরা আদায় করবেন। যদি কেউ নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক নাও থাকেন
তবুও সুন্নত বা নফল হিসেবে হলেও সদকাতুল ফিতর প্রদান করা উত্তম।
৩. রমজানের সুন্নতসমূহঃ রমজান মাসে বিশেষ কিছু সুন্নত রয়েছে,
যথাঃ বিশ রাকাত তারাবিহ সালাত আদায় করা, সেহরি খাওয়া,তাহাজ্জুদ নামাজ আদায়
করা,ইফতার করা ও করানো, কোরআন করিম বেশি বেশি তিলাওয়াত করা এবং শেষ দশ দিন
ইতিকাফ করা। শেষ দশ দিনে বেজোড় রাতগুলোয় শবে কদর তালাশ করা এবং এই দোয়া
পড়া—‘আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউন তুহিব্বুল আফওয়া ফাফু আন্নী, অর্থ—হে
আল্লাহ! আপনি ক্ষমাশীল, ক্ষমা করা পছন্দ করেন, সুতরাং আমাকে ক্ষমা করে দিন।
৪. বিশেষ নফল আমলসমূহঃ রমজানে প্রতিটি ইবাদতের বিনিময় সত্তরগুণ
বৃদ্ধি করে দেওয়া হয়। একটি নফল পালন করলে একটি ফরজ পালন করার সমান সওয়াব
পাওয়া যায়। তাই রমজান মাসে নফল ইবাদত খুবই গুরুত্বপূর্ণ। রমজান মাসের বিশেষ
নফল আমলসমূহ হলোঃ কোরআন মাজিদ একাধিকবার খতম বা পূর্ণ পাঠ করা, কালিমা
তৈয়্যবা বেশি বেশি পাঠ করা, দরুদ শরিফ বেশি বেশি পাঠ করা, তওবা ও
ইস্তিগফার করতে থাকা, সর্বদা তসবি তাহলীল ও জিকির করতে থাকা, দীনী শিক্ষা ও
দীনী দাওয়াতি কাজে মশগুল থাকা।
৫. রমজানে পবিত্রতা রক্ষা করাঃ রমজান মাস মুসলিমদের জন্য
পবিত্র এবং আত্মবিশ্লেষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়। এই মাসে পবিত্রতা রক্ষা
করা অনেক বেশি জরুরি, কারণ এটি আত্মশুদ্ধি এবং আল্লাহর প্রতি কাছে আসার
একটি উপায়। রমজানের পবিত্রতা রক্ষা করার জন্য কিছু নির্দেশনা হলোঃ রোজা
রাখতে গিয়ে কোনো ধরনের খারাপ কাজ বা অশুদ্ধ কথাবার্তা থেকে নিজেকে দূরে
রাখতে হবে।
এটা শুধু খাওয়া-পানার সময়কাল নয়, বরং পুরো মাসটি একটি আধ্যাত্মিক
শিক্ষা।ওয়াজিব কাজের মধ্যে রোজা, নামাজ, দোয়া, কুরআন তিলাওয়াত এবং অন্যান্য
ধর্মীয় কর্মগুলো পূর্ণ হৃদয়ে এবং সঠিক নিয়মে করতে হবে। রোজা, সাদাকাহ
(দান), এবং তাহাজ্জুদ নামাজের মাধ্যমে সঠিকভাবে ধর্মীয় দায়িত্ব পালন করা।
কোনো ধরনের অশ্লীলতা বা মন্দ কাজ থেকে বিরত থাকতে হবে, যেন মন ও হৃদয়
পবিত্র থাকে।
রমজান মাসের অন্যান্য আমলসমূহ
১. তারাবি নামাজঃ রমজান মাসের রাতের নামাজ হলো তারাবি, যা
ঐতিহ্যবাহী সুনান। এটি ২০ রাকআত পড়া হয়, যদিও কিছু মসজিদে ৮ রাকআতও আদায় করা
হয়। তারাবি নামাজ রমজানের রাতে আল্লাহর কাছে আরও বেশি নৈকট্য অর্জনের এক
গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ।
২. কুরআন তেলাওয়াতঃ রমজান মাসে কুরআন তেলাওয়াতের ফজিলত অনেক
বেশি। এই মাসে অনেক মুসলিম কুরআন খতম করে। যারা পুরো কুরআন এক মাসে পড়েন না,
তারা তিলাওয়াত করে কুরআন শিখার ও বুঝার চেষ্টা করেন। কুরআন তেলাওয়াতের
মাধ্যমে আল্লাহর পক্ষ থেকে রহমত ও বরকত পাওয়া যায়।
৩. যাকাত দেওয়াঃ যাকাত একটি ফরজ ইবাদত। যাকাতের মাধ্যমে গরিব ও
দরিদ্রদের সাহায্য করা হয়। সাধারণত সম্পত্তির ২.৫% যাকাত দিতে হয়। রমজান মাসে
যাকাত দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এই মাসে দান-খয়রাতের অনেক বেশি বরকত
থাকে।
৪. ইতেকাফঃ রমজান মাসের শেষ দশ দিনে ইবাদত বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে
মসজিদে একান্তভাবে আল্লাহর ইবাদত করার নাম ‘ইতেকাফ’। ইতেকাফে অবস্থানকারী
মুসলিম নফল নামাজ, দুআ এবং কুরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে একান্তভাবে আল্লাহর
সঙ্গে সম্পর্ক গড়ার চেষ্টা করেন।
৫. দুআ এবং তাওবাঃ রমজান মাস তাওবা করার জন্য এক বিশেষ সুযোগ।
আল্লাহ এই মাসে নিজের বান্দাকে ক্ষমা করে দেন, তাই এই মাসে নিজের ভুল-ত্রুটি
স্বীকার করে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিত। রমজান মাসে আল্লাহর রহমত,
মাগফিরাত এবং নাজাতের জন্য দুআ করা উচিত। বিশেষত, রোজা খোলার সময় এবং তারাবি
নামাজের সময় দুআ করলে আল্লাহ তার বান্দার দুআ কবুল করেন।
৬. সাদাকাহ ও সাহায্যঃ রমজান মাসে সাদাকাহ (স্বেচ্ছানুদান)
দেওয়ার গুরুত্ব অনেক বেশি। মানুষ এই মাসে বেশি বেশি দানে উৎসাহিত হন যাতে
সমাজের গরিব-দুস্থদের সাহায্য করা যায়। অনেক মুসলিম তাদের ইফতার অন্যদের সাথে
ভাগ করে নেয়। এভাবে গরিবদের ইফতার দেওয়ার মাধ্যমে তাদের সহায়তা করা হয়।
রমজান মাসের করণীয় ও বর্জনীয় বিষয়গুলি
রমজান মাসের করণীয় ও বর্জনীয় বিষয় কিছু বিষয় আছে যা প্রত্যেক রোজাদার ব্যক্তির
জানা গুরুত্বপূর্ণ। রমজান মাস মুসলিমদের জন্য একটি পবিত্র সময়, যেখানে সিয়াম
(রোজা) পালন করা হয়। রমজান আমাদের আত্মবিশ্লেষণের সুযোগ দেয়, নিজের ভুলগুলো
শুধরানোর, আল্লাহর নৈকট্য লাভের এবং আরও পবিত্র জীবনযাপন করার জন্য। নিচে রমজান
মাসের করণীয় ও বর্জনীয় বিষয়গুলি আরও বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো।
১. রমজানে করণীয় বিষয়ঃ
রোজা রাখাঃ রোজা হল সেহরি থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার এবং দৈহিক
ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষা থেকে বিরত থাকা। রোজা রাখার উদ্দেশ্য হলো আত্মবিশুদ্ধি,
আল্লাহর প্রতি আনুগত্য ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা। রোজার সময় খাওয়ার জন্য দুটি
প্রধান সময়: সেহরি (সকালে) এবং ইফতার (সন্ধ্যায়)। সেহরিতে অতিরিক্ত খাওয়া উচিৎ
নয়, বরং পরিমিত খাবার গ্রহণ করা উচিত। ইফতারেও অতিরিক্ত ভোজন পরিহার করা উচিত।
তারাবীহ নামাজঃ রমজান মাসে তারাবীহ নামাজ সুন্নত। মসজিদে বা ঘরে একসঙ্গে
২০ রাকআত তারাবীহ নামাজ আদায় করা সুন্নত। তারাবীহ নামাজের মাধ্যমে আল্লাহর সাথে
সম্পর্ক দৃঢ় হয় এবং কুরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে ঈমান বাড়ে। একে নিয়মিতভাবে আদায়
করা জরুরি, তবে কাউকে চাপ দেওয়া উচিত নয়, কারণ এটি সুন্নত এবং ঐচ্ছিক।
কুরআন তিলাওয়াতঃ রমজান মাস কুরআন নাজিলের মাস, সুতরাং কুরআন তিলাওয়াতের
প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া উচিত। প্রতিদিন কিছু পরিমাণ কুরআন তিলাওয়াত করতে
হবে, যেহেতু কুরআন আমাদের জীবনের নির্দেশিকা। মুছাহিদাত (কুরআনের অর্থ বুঝে
পাঠ) আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ, তাই তিলাওয়াতের পাশাপাশি কুরআনের অর্থ বোঝা ও শেখা
উচিৎ।
দোয়া ও ইস্তিগফারঃ রমজান মাসে আল্লাহর কাছে দোয়া করা এবং তার সান্নিধ্য
লাভ করার জন্য প্রচুর ইস্তিগফার করা জরুরি। বিশেষত লাইলাতুল কদর (কদরের রাত) এর
মধ্যে দোয়া করা ও ক্ষমা প্রার্থনা করা অত্যন্ত মঙ্গলময়। আল্লাহর কাছে সব ধরনের
আধ্যাত্মিক ও দৈহিক চাহিদা পূরণের জন্য দোয়া করুন।
দান-খয়রাতঃ রমজান মাসে দান-খয়রাতের গুরুত্ব অনেক বাড়ে। আল্লাহর রাসূল
(সা.) বলেছেন, "রমজান মাসে দান করা সবচেয়ে বেশি বরকতপূর্ণ। গরিবদের সাহায্য
করা, অভাবীদের খাওয়ানো এবং যাকাত প্রদান করা অপরিহার্য। ফিতরা (যাকাতুল ফিতর)
ঈদুল ফিতরের সময় গরিবদের সাহায্য করার জন্য দেওয়া হয়। রমজান মাসে তার যথাযথ
পরিমাণ প্রদান করা উচিত।
তাওবা করাঃ রমজান মাসে তাওবা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি
আত্মবিশুদ্ধি ও সঠিক পথে ফিরে আসার এক সুবর্ণ সুযোগ। তাওবা (অর্থাৎ পাপ থেকে
ফিরে আসা) মানুষের আত্মার পরিশুদ্ধি ঘটায় এবং আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা
করার জন্য এটি এক বিশেষ সময়।
২. রমজানে বর্জনীয় বিষয়ঃ
মিথ্যা বলাঃ রোজা থাকার সময় মিথ্যা বলা বা গীবত (অন্যের সমালোচনা) করা
রোজার সঠিকতা ক্ষুণ্ন করে। এর মাধ্যমে রোজার মূল উদ্দেশ্য (আত্মবিশুদ্ধি)
ব্যাহত হয়। রাসূল (সা.) বলেছেন, "যে ব্যক্তি মিথ্যা বলার ও কাজের মাধ্যমে রোজা
ভঙ্গ করে, তার রোজা ভেঙে যাবে।" (বুখারি)
গীবত ও নিন্দাঃ রমজানে গীবত (অন্যের সমালোচনা করা) এবং নিন্দা (অথবা
অন্যের গোপন বিষয় প্রকাশ করা) করার কোনো সুযোগ নেই। এটি মানুষের ধর্মীয় মর্যাদা
ও পুণ্যকে নষ্ট করে।গীবত মানুষকে দুঃখিত করে এবং রোজার সাথে এর কোনো সম্পর্ক
নেই।
অশ্লীল কাজ ও কথাঃ রমজানে অশ্লীল ভাষা ব্যবহার করা, অশালীন রসিকতা করা,
অশ্লীল দৃষ্টি দেওয়া বা অন্যের সম্মান হানির কাজ পরিহার করতে হবে। পবিত্র রমজান
মাসে শালীনতা বজায় রাখা এবং নিজের চরিত্রকে শুদ্ধ রাখা অপরিহার্য।
অতিরিক্ত খাওয়া ও পান করাঃ সেহরি বা ইফতার সময় অতিরিক্ত খাওয়া বা পান
করা শরীরের ক্ষতি করতে পারে এবং রোজার গুরুত্ব হ্রাস পায়। সেহরি ও ইফতারে
পরিমিত খাবার খাওয়া উচিত, যাতে শরীর সুস্থ থাকে এবং রোজা পালন করতে অসুবিধা না
হয়।
অতিরিক্ত সময় নষ্ট করাঃ রমজান মাসে সময় নষ্ট করে অপ্রয়োজনীয় কার্যক্রমে
লিপ্ত হওয়া, যেমন ফেসবুক বা টেলিভিশন দেখার প্রতি অতিরিক্ত মনোযোগ দেওয়া, তা
পরিহার করতে হবে। এই সময়টাকে ইবাদত, কুরআন তিলাওয়াত, দোয়া এবং গরিবদের সাহায্য
করার মধ্যে ব্যয় করা উচিত।
যাদের জন্য রোজা না রাখার অনুমতি রয়েছে
রমজান মাসে প্রাপ্তবয়স্ক সকল মুসলমানের উপর রোজা ফরজ। তবে কিছু ব্যতিক্রম
রয়েছে, যাদের রোজা না রাখার অনুমতি দিয়েছে ইসলাম। ইসলামের প্রতিটি ইবাদত
মানুষের শক্তি-সামর্থ্যের প্রতি লক্ষ্য রেখেই প্রণীত। আল্লাহ তাআলা মানুষের
সাধ্যের বাইরে কোনো কাজ চাপিয়ে দেননি। রোজা ইসলামের অন্যতম শারীরিক ইবাদত।
যেকোনো সুস্থ-স্বাভাবিক মানুষই তা অনায়াসে আদায় করতে পারে।
তাই প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থ, সবল ও মানসিকভাবে সুস্থ মুমিনের জন্য রোজা
রাখা আবশ্যক করেছে ইসলাম। তবে বিশেষ কারণে, একান্ত প্রয়োজনের মুহূর্তে রোজা
না রাখা বা ভেঙে ফেলার অবকাশ ইসলামে রয়েছে। এখান আমিএমন লোকদের ব্যাপারে
আলোচনা করব— যাদের রমজান মাসে রোজা না রাখলেও চলে। তবে কোন অবস্থায় ও কোন
পর্যায়ে না রাখার সুযোগ রয়েছে, তা বিস্তারিত জানতে এই প্রাসঙ্গিক মাসআলাগুলো
জেনে নিন।
১. রোগী (অসুস্থ ব্যক্তি)
- প্রকারঃ যারা তীব্র বা দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতায় ভুগছেন, অথবা এমন কোনো অসুস্থতা রয়েছে যা রোযা রাখলে তাদের শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি ঘটতে পারে।
- বিস্তৃতিঃ যদি ব্যক্তি কোনও শারীরিক সমস্যায় ভুগছেন (যেমন, জ্বর, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ইত্যাদি) এবং রোযা রাখলে সমস্যা আরও বাড়বে, তবে তারা রোযা রাখবেন না।
- কিভাবে পূর্ণ করবেনঃ যদি পরবর্তী সময়ে তারা সুস্থ হন, তবে তারা রোযা রেখে মিস করা রোযাগুলি পূর্ণ করতে পারেন। তবে, যদি চিকিৎসকের পরামর্শে রোযা রাখা সম্ভব না হয়, তবে ফিদিয়া (গরিবদের জন্য খাবার প্রদান) দিতে হবে।
২. যাত্রী (সফরকারী)
- প্রকারঃ যারা দীর্ঘ যাত্রায় আছেন এবং রোযা রাখলে তাদের জন্য কষ্টকর বা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। সাধারণত, ৮০ কিলোমিটার বা তার বেশি সফর করলে রোযা না রাখার অনুমতি রয়েছে।
- বিস্তৃতিঃ দীর্ঘ পথযাত্রা বা বিমান ভ্রমণের সময়, যদি রোযা রাখলে শারীরিকভাবে অস্বস্তি বা ক্ষতি হতে পারে, তাহলে রোযা না রাখার অনুমতি রয়েছে।
- কিভাবে পূর্ণ করবেনঃ সফর শেষে রোযাগুলি পূর্ণ করতে হবে। সফর শেষ হওয়ার পর যতটুকু সময় বাকি থাকে, সে সময়ের মধ্যে রোযা রাখতে হবে।
৩. গর্ভবতী বা স্তন্যদায়ী মা
- প্রকারঃ গর্ভবতী বা স্তন্যদায়ী মায়ের ক্ষেত্রে যদি রোযা রাখলে তার নিজের বা তার শিশুর ক্ষতির সম্ভাবনা থাকে, তবে তাদের জন্য রোযা না রাখার অনুমতি রয়েছে।
- বিস্তৃতিঃ গর্ভবতী মায়েরা যদি শারীরিকভাবে দুর্বল অনুভব করেন, অথবা স্তন্যদানকারী মায়েরা যদি শারীরিকভাবে তেমন শক্তি না পান, তবে রোযা না রাখার অনুমতি দেওয়া হয়।
- কিভাবে পূর্ণ করবেনঃ যদি তারা রোযা রাখতে পারেন না, তবে তাদের ফিদিয়া প্রদান করতে হবে বা পরবর্তীতে রোযা পূর্ণ করতে হবে।
৪. বয়সের কারণে অক্ষম ব্যক্তিরা
- প্রকারঃ অত্যধিক বয়স্ক ব্যক্তিরা, যারা শারীরিকভাবে রোযা রাখতে অক্ষম, তাদের জন্য রোযা না রাখার অনুমতি রয়েছে।
- বিস্তৃতিঃ যারা অত্যধিক বয়সের কারণে রোযা রাখার জন্য শারীরিকভাবে অক্ষম, তাদের জন্য রোযা রাখতে বলা হয় না।
- কিভাবে পূর্ণ করবেনঃ তারা সাধারণত ফিদিয়া দিয়ে রোযা পূর্ণ করবেন। যদি তারা রোযা রাখতে না পারেন, তাদের জন্য প্রতি দিন একটি গরিবকে খাওয়ানোর পরামর্শ দেওয়া হয়।
৫. মানসিক অসুস্থতা
- প্রকারঃ যারা মানসিক অসুস্থতায় ভুগছেন (যেমন, গভীর অবসাদ, মানসিক বিভ্রান্তি), তাদেরও রোযা রাখার অনুমতি নেই যদি শারীরিক বা মানসিক অবস্থা রোযা রাখার জন্য অক্ষম করে তোলে।
- বিস্তৃতিঃ এক্ষেত্রে, যদি তাদের মানসিক অবস্থা রোযা রাখার জন্য উপযুক্ত না হয়, তবে তারা রোযা রাখতে পারেন না।
- কিভাবে পূর্ণ করবেনঃ তাদেরও ফিদিয়া প্রদান করতে হতে পারে যদি তাদের অবস্থার উন্নতি না হয়।
৬. অস্থায়ী অসুস্থতা বা ক্ষুদ্র পরিস্থিতি যেমন
- মাসিক বা হায়েজঃ নারীদের মাসিক বা রক্তস্রাবের সময় রোযা রাখা ফরজ নয়। এসময় রোযা রাখতে বলা হয় না।
- নিপতিত অবস্থা যেমন, গর্ভপাতঃ গর্ভপাতের পর কিছুদিন রোযা রাখার অনুমতি নেই।
৭. অন্যান্য বিশেষ কারণ যেমন
- ভীষণ ক্লান্তিঃ যদি কোনো ব্যক্তির শরীর অতিরিক্ত ক্লান্ত হয়ে যায় এবং রোযা রাখলে তার স্বাস্থ্য আরো খারাপ হবে।
- বিস্মৃতিঃ যদি কেউ ভুলে রোযা ভেঙে ফেলেন (যেমন খাওয়া বা পান করা), তবে তার জন্য রোযা পুনরায় রাখতে বলা হয় না।
রোজা সম্পর্কে প্রচলিত কিছু ভুল ধারণা
রোজা সম্পর্কে প্রচলিত কিছু ভুল ধারণা রয়েছে যা অনেক মানুষ না জেনেই বিশ্বাস
করে। তবে রোজা সম্পর্কে এই ভুল ধারণাগুলো পরিষ্কার হওয়া দরকার, যাতে আমরা
শুদ্ধভাবে রোজা পালন করতে পারি। রোজা ইসলাম ধর্মের অন্যতম স্তম্ভ এবং ইবাদতের
বিশেষ একটি অংশ। ইসলামের বিধান সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার জন্য কুরআন ও সহিহ
হাদিস অনুসরণ করাই উত্তম। তাই, রোজা সম্বন্ধে প্রচলিত তেমনই কিছু ভুল ধারণা
সম্বন্ধে জেনে নেওয়া প্রয়োজন।
মুখের লালা গিলে ফেললে রোজা ভেঙ্গে যায়ঃ মুখের লালা যদি পেটে চলে
যায়, তাহলে রোজা ভেঙ্গে যাবে; এটি একটি বহুল চর্চিত কথা। এই প্রচলিত ধারণার
কারণে রমজানে মানুষ যেখানে সেখানে থু থু ফেলে। এতে করে রোজাদার ব্যক্তিটি
একদিকে যেমন পরিবেশের ক্ষতি করছেন, অন্যদিকে তিনি পাশের মানুষকেও অস্বস্তিতে
ফেলছেন। মুখের লালা গিলে ফেললে কিচ্ছু হয় না রোজার। এ বিষয়ে ধর্মে কোনও
নিষেধাজ্ঞা নেই অর্থাৎ, ইন্টার্নাল কিছু পেটে ঢুকলে রোজা ভেঙ্গে যাবে না। তবে
অন্য কারও মুখের লালা যদি নিজের মুখে যায়, তাহলে রোজা থাকবে না। অর্থাৎ, রোজা
পালন করা অবস্থায় সঙ্গীকে চুমু খাওয়া যাবে না।
দাঁত ব্রাশ করা যাবে নাঃ অনেকে বলেন রোজা রাখা অবস্থায় দাঁতও
ব্রাশ করা যাবে না। কিন্তু দীর্ঘ সময় দাঁত ব্রাশ না করার কারণে মুখে দুর্গন্ধ
তৈরি হয় এবং তাতে কথা বলার সময় চারপাশে গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু এই গন্ধ বিষয়ে
অনেক রোজাদারকে বলতে শোনা যায়, রোজাদার ব্যক্তির মুখের গন্ধও ভালো বা রোজাদার
ব্যক্তির মুখের গন্ধে বিরক্ত হওয়া যাবে না। দাঁত ব্রাশ করলে রোজার কিচ্ছু হবে
না। তবে পেস্ট আছে তো, ভুলে গলায় চলেও যেতে পারে। পেস্ট গলায় গেলে রোজা
মাকরূহ হবে। সেজন্য এটা সাহরী খাওয়ার আগে করাই ভালো।
নখ এবং চুল কাটা যাবে নাঃ এরকমই প্রচলিত আরেকটা ধারণা হলো, রোজা
রাখা অবস্থায় কিছুতেই নখ ও চুল কাটা যাবে না। তবে ‘নখ, চুল কাটা যাবে না; এটা
একদম ভুল কথা। কারণ এগুলোতে তো রক্ত প্রবাহিত হচ্ছে না। আর এগুলো সাধারণত
দিনের বেলাতেই মানুষ করে এবং একইসাথে রোজাও মানুষ দিনের বেলাতেই রাখে।
দাড়ি কামানো যাবে নাঃ রোজা রাখলে পুরুষরা দিনে দাড়ি কামাতে
পারবেন না, এমন একটি মিথও প্রচলিত আছে। কিন্তু বাস্তবে তারা যে কোনও সময়েই
দাড়ি কামাতে পারবেন। এ নিয়ে কোনও বাধা-নিষেধ নেই। তবে দাড়ি কামানোর সময়
শুধুমাত্র একটি বিষয় লক্ষ্য রাখতে হবে যে ‘গাল কেটে গিয়ে রক্ত না গড়ায়’।
রমজানে যৌন সম্পর্ক করা যাবে নাঃ কেউ কেউ মনে করেন, পুরো রমজান মাসে
সঙ্গীর সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করা যাবে না। কিন্তু যৌন সম্পর্ক স্থাপনের
বিধিনিষেধ শুধুমাত্র রোজা থাকা অবস্থায়। আর মানুষ রোজা রাখে দিনের বেলায়।
তাই, রোজা না থাকলে রমজানে সঙ্গীর সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপনে কোনও বাধা নেই।
রোজা রাখা অবস্থায় কোনও যৌন সম্পর্ক করলে রোজা ভেঙ্গে যাবে।
সুগন্ধি ব্যবহার করা যাবে নাঃ অনেকের মতে, রোজা রেখে সুগন্ধি
ব্যবহার করা যাবে না। কিন্তু, মানুষের মনে গেঁথে থাকা এই ধারণাও ভিত্তিহীন।
সুগন্ধি বলতে আতর ব্যবহার করা যাবে, এটা তো নবীর সুন্নত। যুগে যুগে নবী
রাসূলরা আতর ব্যবহার করে গেছেন। এটা ব্যবহারে কোনও নিষেধ নেই। তবে পারফিউম
ব্যবহারের বিষয়ে এক ধরনের ‘সতর্কতা’ আছে।
কারণ পারফিউম তৈরিতে নাকি চর্বি ব্যবহৃত হয়। এটা তো আমরা জানি না। তাই এটা
ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকলেই বেশি ভালো হয়, শুধু আতর ব্যবহার করা ভালো। তবে
বেশি তাকওয়া (ধার্মিকতা বা ধর্মপরায়ণতা) দেখাতে চাইলে দিনের বেলা ব্যবহার না
করাই ভালো। একদম-ই ব্যবহার না করা আরও ভালো।
ভুল করে পানাহার করে ফেললে রোজা ভাঙ্গেঃ অনেকসময় এমন হয় যে একজন
ব্যক্তি সারাদিন ধরে রোজা আছেন। কিন্তু হঠাৎ হয়তো মনের ভুলে সে খাবার খেয়ে
ফেললো বা পানি পান করে নিলো।কিন্তু সম্বিৎ ফিরে পাওয়ার পর ঐ রোজাদার ব্যক্তি
ভাবেন যে তার রোজা সম্পূর্ণভাবে ভেঙ্গে গেছে। এটা ভেবে হয়তো তখন সে পরিপূর্ণ
আহারই করে ফেলেন।
এ প্রসঙ্গে মনের ভুলে ভরপেট খাবার খেলেও রোজা ভেঙ্গে যাওয়ার কথা ইসলামে বলা
হয়নি। এতে রোজা মাকরূহ হতে পারে। রোজা ভেঙ্গে যাবে, যদি ব্যক্তি ইচ্ছা করে
পানাহার করে। এখানে মাকরূহ অর্থকে তিনি ব্যাখ্যা করেন এভাবে, “মাকরূহ মানে
অপছন্দনীয়। মাকরূহ মানে— রোজা হয়ে যাবে, কিন্তু রোজার সৌন্দর্যবোধটা শতভাগ
হলো না। মুখে খাবার নেওয়ার পর যখনই মনে আসবে, তখন ফেলে দিতে হবে। আর গেলা
যাবে না।
রোজা রেখে ধূমপান করা যাবেঃ অবাক লাগলেও এটি সত্য যে অনেকে মনে
করেন যে সিগারেট তো কোনও খাবার বা মাদক না, তাই রোজা রাখা অবস্থায় ধূমপান করা
হলে রোজা ভেঙ্গে যাওয়ার কোনও বিষয় নেই। ধূমপান শুধু রোজা থাকা অবস্থায় না,
রোজা ছাড়াও হারাম। মাদকদ্রব্য অন্যের ক্ষতি করে না, এটি শুধু সেবনকারীর ক্ষতি
করে। তারপরও মাদকদ্রব্য হারাম। সেখানে ধূমপান নিজের ক্ষতি তো করেই, অন্যেরও
ক্ষতি করে। এটি বাতাসে ছড়িয়ে যাচ্ছে। এটা রোজায় না কেবল, রোজা ছাড়াও খাওয়া
ঠিক না। আর যে ধূমপান করছে, সে তো এটা খেয়ে তৃপ্তি পাচ্ছে। অনেকে ভাতের
পরিবর্তে সিগারেট খায়। তাই, এটি খেলে রোজা ভেঙ্গে যাবে।
রান্নার সময় খাবারের স্বাদ গ্রহণ করা যাবে নাঃ যিনি রান্না করেন,
তাকে অনেকসময় রান্নার স্বাদ বোঝার জন্য কিছুটা খাবার খেয়ে দেখতে হয়।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ঘরের রান্নাঘর সামলানোর কাছে নারীদের অংশগ্রহণই বেশি
থাকে। তাই প্রায় প্রত্যেকের ঘরের মা বা বোন রান্নার সময় লবণ, ঝাল ইত্যাদি পরখ
করে দেখেন। কিন্তু এরকম কথাও অনেকে বলেন যে রোজা রেখে খাবারের স্বাদ গ্রহণ
করলে রোজা মাকরূহ হয়ে যায়। খাবারের স্বাদ নেয়া যাবে। লবণ, ঝাল বা স্বাদ বোঝার
জন্য জিহ্বায় লাগানো যায়, এরপর ফেলে দিতে হবে। ঘরে যদি কম বয়সী বা রোজা
রাখেনি এমন কেউ থাকে তাদেরকে দিয়ে খাবারের স্বাদ টেস্ট করালে সবচেয়ে ভালো হয়।
শেষকথাঃ রোজা ভঙ্গের কারণ ও রোজার মাকরুহ সমূহ
ইসলামি শরিয়ামতে, সিয়ামের শুদ্ধতা ও যথার্থতার জন্য নির্ধারিত কিছু বিধিবিধান রয়েছে, যার ব্যতিক্রম ঘটলে রোজা ভঙ্গের কারণ ও রোজার মাকরুহ হয়ে যায়। রমজানের পরিপূর্ণ সুফল পেতে চাই সম্পূর্ণ প্রস্তুতি ও পরিপূর্ণ আমল। রমজান ও রোজার নিয়ম–কানুন ও মাসআলা–মাসায়েল ভালোভাবে জেনে আমল করলেই রমজানের শিক্ষা, লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হাসিল হবে। তা না হলে রোজা উপবাস ভিন্ন আর কিছুই নয়। সকল প্রকার অন্যায় অবিচার জুলুম অশ্লীলতা ও পাপাচার থেকে দূরে থাকা ও অন্যদেরও দূরে রাখা।
কারও সঙ্গে দুর্ব্যবহার না করা, সবার সঙ্গে ক্ষমা ও দয়ার আচরণ করা। আত্মীয়-স্বজনের খোঁজ-খবর নেওয়া ও তাঁদের সাহায্য সহযোগিতা করা। গরিব
আত্মীয়স্বজন ও পাড়া-প্রতিবেশীদের সেহরি ও ইফতারের ব্যবস্থা করা। মা–বাবা,
ভাই-বোন, স্ত্রী-সন্তানদের সামর্থ্য মতো নতুন জামা কাপড় ও বিভিন্ন উপহার উপঢৌকন
দেওয়া রমজানের অতীব গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ মাহাত্ম্যপূর্ণ ইবাদত। আশা করছি, রোজা
ভঙ্গের কারণ ও রোজার মাকরুহ সমূহ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সমূহ জানতে
পেরেছেন
বিডি টেকল্যান্ডের নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটা কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url