গর্ভাবস্থায় প্রস্রাবে ইনফেকশনের লক্ষণ ও প্রতিকার


গর্ভাবস্থায় প্রস্রাবে ইনফেকশনের লক্ষণ ও প্রতিকার সম্পর্কে সকল মায়েদের জেনে রাখা প্রয়োজন। একটি মেয়ের জীবন পরিপূর্ণতা পায় মা হওয়ার মাধ্যমে। একজন মেয়েকে মা হতে হলে অনেক সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। বিশেষ করে সমস্যাটি হয় গর্ভাবস্থায়। গর্ভাবস্থায় মেয়েদের বিভিন্ন ধরনের ইনফেকশন হয়।
গর্ভাবস্থায়-প্রস্রাবে-ইনফেকশনের-লক্ষণ-ও-প্রতিকার
একটু ভুলের কারণে গর্ভের সন্তান ও মায়ের অনেক সমস্যা হয়। এই সময় অনেক সাবধানতা অবলম্বন করতে হয়। গর্ভাবস্থায় বিশেষ করে প্রস্রাবের ইনফেকশন হয়। এই সময় প্রস্রাবের জ্বালাপোড়া হয়। প্রস্রাবে ইনফেকশন হলে মেয়ের শারীরিক সমস্যার সৃষ্টি হয়। এই সমস্যাগুলো দেখা দিলে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে।

পোস্ট সূচিপত্রঃ গর্ভাবস্থায় প্রস্রাবে ইনফেকশনের লক্ষণ ও প্রতিকার

গর্ভাবস্থায় ফাঙ্গাল ইনফেকশন

গর্ভাবস্থায় ফাঙ্গাল ইনফেকশন সাধারণত ইস্ট ইনফেকশন (Yeast Infection) নামে পরিচিত, যা ক্যানডিডা (Candida) ফাঙ্গাস দ্বারা সৃষ্ট হয়। গর্ভাবস্থায় হরমোনের পরিবর্তনের কারণে যোনির স্বাভাবিক ব্যাকটেরিয়ার ভারসাম্য নষ্ট হয়ে ফাঙ্গাস বৃদ্ধির জন্য উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি হয়। এটি শরীরের আর্দ্রতা বৃদ্ধির কারণে বেশি দেখা যায়। এটি সাধারণত ক্ষতিকর নয়, তবে এটি বেশ অস্বস্তিকর হতে পারে। 

গর্ভাবস্থায় সাধারণ ফাঙ্গাল ইনফেকশনের ধরনঃ

১. ভ্যাজাইনাল ইস্ট ইনফেকশন (Vaginal Yeast Infection):

কারণঃ

  • গর্ভাবস্থায় ইস্ট্রোজেন এবং প্রোজেস্টেরন হরমোনের মাত্রা বেড়ে যায়, যা ফাঙ্গাস বৃদ্ধির জন্য সহায়ক পরিবেশ তৈরি করে।
  • শরীরে গ্লুকোজের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়, যা ক্যানডিডা ফাঙ্গাসের জন্য খাবার হিসেবে কাজ করে।
  • প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়, যার ফলে সংক্রমণ প্রতিরোধ করা কঠিন হয়ে যায়।
লক্ষণঃ

  • চুলকানি ও জ্বালাপোড়া
  • সাদা, ঘন, দইয়ের মতো স্রাব
  • লালচে ও ফোলা ত্বক
  • যৌন মিলনের সময় বা প্রস্রাবের সময় ব্যথা
২. ত্বকের ফাঙ্গাল সংক্রমণঃ

কারণঃ

  • শরীরের আর্দ্রতা বৃদ্ধি পায়
  • অতিরিক্ত ঘাম হওয়া
  • টাইট বা ভেজা কাপড় পরা
 লক্ষণঃ

  • লালচে, ফোলা, চুলকানিযুক্ত দাগ
  • চামড়া ফাটতে থাকা বা খোসা উঠা
  • দুর্গন্ধযুক্ত ঘাম
৩. অ্যান্থলিটিস (Athlete's Foot) ও নখের ফাঙ্গাল ইনফেকশনঃ

লক্ষনঃ

  • সাধারণত পায়ে দেখা যায়
  • ফাটা চামড়া, চুলকানি, নখের রঙ পরিবর্তন
কারণসমূহঃ

  • গর্ভাবস্থায় উচ্চমাত্রার ইস্ট্রোজেন ও প্রোজেস্টেরন
  • রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়া
  • অতিরিক্ত ঘাম
  • ভেজা বা আর্দ্র পরিবেশে বেশি সময় থাকা
  • অ্যান্টিবায়োটিক সেবন
ফাঙ্গাল ইনফেকশন হওয়ার ফলে গর্ভাবস্থায় অনেক সমস্যা হয়। ফাঙ্গাল ইনফেকশন হলে ইনফেকশন স্থানে চুলকায় এবং ঘায়ের সৃষ্টি হয়। এই কারণে গর্ব অবস্থায় অনেক সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়। সবকিছু ঠিকমতো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখলে ফাঙ্গাল ইনফেকশন হওয়ার সম্ভাবনা অনেকাংশই কমে যায়।

প্রস্রাবে ইনফেকশন হলে কি  কি সমস্যা হয়

প্রস্রাবে ইনফেকশন হলে বিভিন্ন ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে। আমাদের শরীর থেকে প্রস্রাবের মাধ্যমে বর্জ ও অতিরিক্ত পানি বের হয়ে যায়। প্রস্রাব বেরিয়ে যাওয়ার সম্পূর্ণ প্রক্রিয়ার সাথে জড়িত অঙ্গ গুলো নিয়ে মূত্র তন্ত্র গঠিত। মূত্র তন্ত্রের যে কোন অংশে যদি জীবাণুর আক্রমণ হয় তাহলে সেটাকেই ইউরিন ইনফেকশন বলে। এই সমস্যাটি নারী-পুরুষ উভয়ের মধ্যেই হয়ে থাকে। এটি সাধারণত ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণের কারণে হয় এবং নিম্নলিখিত উপসর্গ দেখা দিতে পারে

উপসর্গঃ

  • প্রস্রাব করার সময় জ্বালা বা ব্যথা অনুভব করাপ্রস্রাব ঘন ঘন হওয়া, কিন্তু অল্প পরিমাণে বের হওয়া
  • প্রস্রাবের রঙ ঘোলা বা লালচে হওয়া (রক্ত মিশে যেতে পারে)
  • প্রস্রাব থেকে দুর্গন্ধ বের হওয়া
  • পেটের নিচের অংশ বা কোমরের পাশে ব্যথা অনুভব করা
  • জ্বর, ঠান্ডা লাগা বা ক্লান্তি বোধ করা (সংক্রমণ বেশি হলে)
প্রস্রাবে ইনফেকশন হলে যে সমস্যা হতে পারেঃ

  • কিডনিতে ছড়িয়ে পড়তে পারেঃ সংক্রমণ দীর্ঘদিন চিকিৎসা না করলে এটি কিডনিতে ছড়িয়ে গিয়ে পাইলোনেফ্রাইটিস (কিডনির সংক্রমণ) হতে পারে, যা গুরুতর সমস্যা তৈরি করতে পারে।
  • সেপ্টিসেমিয়া, রক্তে সংক্রমণঃ মারাত্মক অবস্থায় UTI যদি রক্তে ছড়িয়ে যায়, তবে এটি জীবনহানির ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
  • গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রে ঝুঁকিঃ গর্ভাবস্থায় UTI হলে অকাল প্রসব বা কম ওজনের শিশুর জন্ম হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
  • প্রস্রাবে পাথরঃ দীর্ঘমেয়াদী সংক্রমণ থেকে মূত্রথলিতে পাথর তৈরি হতে পারে।
ইউরিন ইনফেকশন হলে সাধারণত এসব সমস্যায় হয়। গর্ভবতী মেয়েদের বিশেষ করে ইউরিন ইনফেকশন হয়ে থাকে।

গর্ভাবস্থায় প্রস্রাবে ইনফেকশনের লক্ষণ

গর্ভাবস্থায় প্রস্রাবে ইনফেকশনের লক্ষণ একটি সাধারণ সমস্যা। এটি সাধারণত ব্যাকটেরিয়ার কারণে হয় এবং জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে, কারণ সংক্রমণ কিডনিতে ছড়িয়ে পড়লে মা ও শিশুর জন্য গুরুতর জটিলতা দেখা দিতে পারে। গর্ভাবস্থায় প্রতিটি মেয়ের জন্য একটি স্মরণীয় সময়। এই সময়ে মেয়েদের বিভিন্ন ধরনের শারীরিক সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে প্রস্রাবে ইনফেকশন। 

প্রস্রাবের ইনফেকশন রোগকে বলা হয় ইউরিন ইনফেকশন। এই সমস্যাটি হলে অনেক ভোগান্তিতে পড়তে হয়। ইউরিন ইনফেকশনের যদি সময়মতো চিকিৎসা না করা হয় তাহলে গর্ভ অবস্থায় খারাপ প্রভাব পড়তে পারে। গর্ভাবস্থায় প্রস্রাবে ইনফেকশন হলে বিভিন্ন ধরনের লক্ষণ দেখা যায়। নিম্নে গর্ভাবস্থায় প্রস্রাবে ইনফেকশনের লক্ষণ গুলো বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলোঃ

প্রস্রাবে সংক্রমণের লক্ষণঃ প্রস্রাবে সংক্রমণের লক্ষণগুলি বিভিন্ন হতে পারে, তবে সাধারণত এটি যে কোনও বা একাধিক উপসর্গে দেখা যেতে পারেঃ

  • প্রস্রাবের সময় ব্যথা বা জ্বালাঃ প্রস্রাবের সময় মূত্রথলির বা ইউরেথ্রার (পিপার পথ) ব্যথা হতে পারে।
  • প্রস্রাবের ঘন ঘন অনুভূতিঃ প্রতি সময়ে অনেক কম প্রস্রাব আসতে পারে, তবে চেষ্টার পরেও সম্পূর্ণভাবে প্রস্রাব হতে চায় না।
  • অস্বাভাবিক প্রস্রাবের রঙঃ প্রস্রাব রক্তমিশ্রিত বা ঘোলা হতে পারে।
  • পেটের নীচে ব্যথা বা চাপঃ মূত্রথলি বা পেটের নিচের অংশে ব্যথা অনুভূত হতে পারে।
  • বিশেষ করে শিশুরা এবং বৃদ্ধদের মধ্যে তাপমাত্রা বৃদ্ধির লক্ষণ দেখা যেতে পারে।
যদি সংক্রমণ কিডনিতে ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে বাড়তি লক্ষণ দেখা দিতে পারেঃ

  • উচ্চমাত্রার জ্বর ও কাঁপুনি
  • কোমর বা পিঠের নিচের অংশে তীব্র ব্যথা
  • বমি বা বমি বমি ভাব
  • রক্তমিশ্রিত প্রস্রাব
গর্ভাবস্থায় UTI হলে জটিলতাঃ যদি UTI ঠিকমতো চিকিৎসা না করা হয়, তবে এটি কিডনি সংক্রমণ (Pyelonephritis) বা অন্যান্য জটিলতা সৃষ্টি করতে পারেঃ

  • প্রিম্যাচিউর ডেলিভারি (অকাল প্রসব)
  • লো বার্থ ওয়েট (কম ওজনের নবজাতক জন্ম নেওয়া)
  • Amniotic fluid সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি
  • Sepsis (রক্তে সংক্রমণ, যা মারাত্মক হতে পারে)

গর্ভাবস্থায় প্রস্রাবে ইনফেকশনের কারণ

গর্ভাবস্থায় প্রস্রাবে ইনফেকশন খুব সাধারণ একটি সমস্যা যা প্রায় ২% থেকে ১০% গর্ভবতী মহিলাকে প্রভাবিত করে। এটি চিকিৎসা না করলে কিডনি ইনফেকশন বা অন্যান্য জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। তাই এটির কারণ সম্পর্কে জানা গুরুত্বপূর্ণ। গর্ভাবস্থায় নারীদের শরীরে কিছু পরিবর্তন হয়, যা UTI হওয়ার ঝুঁকি বাড়ায়। কি কারনে গর্ভাবস্থায় প্রস্রাবে ইনফেকশন ঘটে তা বিস্তারিতভা নিচে আলোচনা করা হলো।

১. হরমোনজনিত পরিবর্তনঃ গর্ভাবস্থায় প্রোজেস্টেরন ও ইস্ট্রোজেন হরমোনের মাত্রা বেড়ে যায়, যা মূত্রথলির পেশিকে শিথিল করে। এটি মূত্রের প্রবাহ ধীর করে এবং ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধির জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করে। ফলে ব্যাকটেরিয়া সহজেই সংক্রমণ ঘটাতে পারে।

২. ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণঃ মূত্রাশয় সংক্রমণের সবচেয়ে সাধারণ কারণ হল ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণ, বিশেষ করে Escherichia coli (E. coli), যা সাধারণত অন্ত্রে বাস করে। এই ব্যাকটেরিয়া মূত্রনালী দিয়ে মূত্রনালীতে প্রবেশ করতে পারে এবং মূত্রাশয়ে সংখ্যাবৃদ্ধি করতে পারে।

৩. যৌন কার্যকলাপঃ যৌন কার্যকলাপ মূত্রনালীর মধ্যে ব্যাকটেরিয়া প্রবর্তন করতে পারে, সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ায়। মূত্রনালীতে প্রবেশ করতে পারে এমন কোনো ব্যাকটেরিয়া বের করে দিতে সাহায্য করার জন্য ভালো স্বাস্থ্যবিধি অনুশীলন করা এবং যৌনমিলনের আগে ও পরে প্রস্রাব করা গুরুত্বপূর্ণ।

৪. বর্ধিত জরায়ুর চাপঃ গর্ভের শিশুর বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে জরায়ু বড় হয়ে মূত্রথলির ওপর চাপ সৃষ্টি করে। এতে মূত্র সম্পূর্ণভাবে বের হতে দেরি হয়, যা ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধির জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করে।

৫. ইমিউন সিস্টেমের পরিবর্তনঃ গর্ভাবস্থায় নারীর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কিছুটা দুর্বল হয়ে যায়, ফলে শরীর সহজেই ইনফেকশনের শিকার হতে পারে।

৬. মূত্রনালীর সংক্ষিপ্ত গঠনঃ নারীদের মূত্রনালী পুরুষদের তুলনায় ছোট হওয়ার কারণে ব্যাকটেরিয়া সহজেই মূত্রথলিতে প্রবেশ করতে পারে।

৭. পর্যাপ্ত পানি পান না করাঃ গর্ভাবস্থায় অনেকেই পর্যাপ্ত পানি পান করতে ভুলে যান। পর্যাপ্ত পরিমানে পানি না খেলে প্রস্রাব কম হয়, যা ব্যাকটেরিয়া বের করে দেওয়ার প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করে।

৮. অতিরিক্ত চিনি বা ডায়াবেটিসঃ গর্ভকালীন ডায়াবেটিস থাকলে প্রস্রাবে শর্করার পরিমাণ বেড়ে যায়, যা ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি ত্বরান্বিত করে।

৯. অপরিচ্ছন্নতা ও ভুল হাইজিনঃ টয়লেট ব্যবহারের পর সঠিকভাবে পরিষ্কার না করা, বিশেষ করে পেছন থেকে সামনে মুছলে ব্যাকটেরিয়া মূত্রনালীতে প্রবেশ করতে পারে।

আপনি যদি গর্ভাবস্থায় প্রস্রাবের সময় জ্বালাপোড়া, ঘন ঘন প্রস্রাবের অনুভূতি, তলপেটে ব্যথা বা প্রস্রাবে দুর্গন্ধ পান, তবে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

গর্ভাবস্থায় প্রস্রাবে ইনফেকশনের প্রতিকার

গর্ভাবস্থায় প্রস্রাব ইনফেকশন হলে সাধারণত উপরের লক্ষণ গুলোই দেখা যায়। গর্ভাবস্থায় প্রস্রাবে সংক্রমণ (ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশন বা ইউটিআই) একটি সাধারণ সমস্যা, যা মা ও শিশুর স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। সঠিক চিকিৎসা ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে এই সমস্যা নিয়ন্ত্রণ করা যায়। সঠিক হবে চলাফেরা করলে প্রস্রাবের ইনফেকশন প্রতিকার করা সম্ভব। নিম্নে গর্ভাবস্থায় প্রস্রাবে ইনফেকশনের প্রতিকার তুলে ধরা হলোঃ

  • ১. পর্যাপ্ত পানি পানঃ পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান করা ইনফেকশন প্রতিরোধে সহায়ক হতে পারে। এটি মূত্রনালি পরিষ্কার রাখে এবং ব্যাকটেরিয়া দূর করতে সাহায্য করে।
  • ২. প্রতিদিন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতাঃ প্রস্রাবের পর ভালোভাবে হাত ধোয়া এবং মলদ্বার থেকে মূত্রনালী (ইউরেথ্রা) বরাবর মুছে নেওয়া ইনফেকশন রোধ করতে সাহায্য করে। বিশেষ করে নারীদের জন্য এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এক্সক্রেশনের পর সামনে থেকে পেছনে পরিষ্কার করুন।
  • ৩. ফলের রসঃ ভিটামিন সি সমৃদ্ধ খাবার যেমন কমলা, জাম্বুরা, আমলকি ইত্যাদি ইনফেকশন রোধে সহায়ক হতে পারে। কমলা বা লেবু, ইউটিআই প্রতিরোধে সাহায্য করতে পারে।
  • ৪. যৌন সম্পর্কের পর প্রস্রাবঃ যৌন সম্পর্কের পর প্রস্রাব করা ব্যাকটেরিয়া বের করে দিতে সাহায্য করে।
  • ৫. এন্টি-ইনফ্ল্যামেটরি বা পেইন রিলিভারঃ যেমন পারাসিটামল বা আইবুপ্রোফেন ব্যথা বা অস্বস্তি কমানোর জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে।
  • ৬. কিছু খাবারের প্রতিক্রিয়াঃ এমন কিছু খাবার যেমন ক্যাফিন, স্পাইসি খাবার, মিষ্টি খাবার প্রায়ই ইউটিআই এর শিকার হতে পারে, তাই এই ধরনের খাবার পরিহার করা উচিত।
  • ৭. ভাল স্যানিটেশনঃ সঠিকভাবে পরিষ্কার থাকুন এবং যথাযথ স্যানিটেশন নিশ্চিত করুন।
এইসব কাজ করলে গর্ভাবস্থায় প্রস্রাবে ইনফেকশন প্রতিকার করা সম্ভব। প্রস্রাবে ইনফেকশন সাধারণত আমাদের চলাফেরার কারণে হয়ে থাকে। সবসময় পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ভাবে চলাফেরা করলে প্রস্রাবের ইনফেকশন থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।

ইউরিন ইনফেকশনের চিকিৎসা

ইউরিন ইনফেকশনের চিকিৎসা অ্যান্টিবায়োটিক দ্বারা করা হয়, কারণ এটি ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ। ইউরেনিন ইনফেকশন হলে সাথে সাথে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। চিকিৎসকের কাছে গেলে ডাক্তার প্রস্রাব পরীক্ষা করতে দিবে। প্রস্রাব পরীক্ষার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ার পরামর্শ দিবে। চিকিৎসক রোগীর বয়স, অবস্থার তীব্রতা, এবং অন্যান্য স্বাস্থ্য সম্পর্কিত ফ্যাক্টরগুলির উপর ভিত্তি করে উপযুক্ত অ্যান্টিবায়োটিক নির্ধারণ করবেন যেমনঃ

সাধারণ অ্যান্টিবায়োটিকের তালিকাঃ

  • ১. সিপ্রোফ্লোক্সাসিন (Ciprofloxacin): এটি একটি সাধারণ অ্যান্টিবায়োটিক, যা ইউটিআই এর জন্য ব্যবহৃত হয়।
  • ২. ট্রিমেথোপ্রিম-সালফামেথক্সাজল (Trimethoprim-sulfamethoxazole): এটি একটি শক্তিশালী অ্যান্টিবায়োটিক যা ইউটিআই চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়।
  • ৩. নিট্রোফুরানটোইন (Nitrofurantoin): ইউটিআই এর প্রাথমিক চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়, বিশেষত মূত্রথলিতে সংক্রমণ থাকলে।
  • ৪. অ্যামোক্সিসিলিন (Amoxicillin): এই অ্যান্টিবায়োটিকটি কিছু ইউটিআই ক্ষেত্রে কার্যকর।
  • ৫. ফসফোমাইসিন (Fosfomycin): এটি একটি একক ডোজ অ্যান্টিবায়োটিক, যা ইউটিআই এর চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়।
ইউরিন ইনফেকশন হলে উপরের এসব ওষুধ নিয়মিত খেলে খুব সহজেই ভালো হয়ে যায়। ইউরিন ইনফেকশন মেয়েদের বেশি হয়। করে সমস্যাটি হয় গর্ভবতী অবস্থায়।

প্রস্রাবে ইনফেকশনের ঘরোয়া চিকিৎসা

প্রস্রাবের ইনফেকশন ডাক্তারি ভাষায় বলা হয় ইউরিন ইনফেকশন। এই সমস্যাটি ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের বেশি হয়। কারণ মেয়েদের মূত্রনালী ও পায়ুপথ কাছাকাছি থাকে। এই কারণে পায়ুপথ দিয়ে নির্গত ব্যাকটেরিয়া গুলো খুব সহজেই মূত্রনালীতে প্রবেশ করতে পারে। এছাড়াও মেয়েদের মূত্রনালী ছেলেদের তুলনায় অনেক ছোট। যার ফলে ব্যাকটেরিয়া খুব সহজে মূত্রনালী দিয়ে কিডনিতে পৌঁছে যায়। যার ফলে খুব সহজেই মেয়েদের প্রস্রাবে ইনফেকশন হয়।

প্রস্রাবে ইনফেকশন ঘরোয়া চিকিৎসার মাধ্যমে ভালো করা সম্ভব। ডাক্তার এর মধ্যে চিকিৎসা করলে এন্টিবায়োটিক ব্যবহার করে। অ্যান্টিবায়োটিকের বিভিন্ন ধরনের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া থাকে। যার ফলে গর্ভবতী মেয়েদের চিকিৎসা করলে অনেক সমস্যার সৃষ্টি হয়। এইসব কারণে ঘরোয়া ভাবে চিকিৎসা করা উচিত। প্রস্রাবে ইনফেকশনের ঘরোয়া চিকিৎসা সমমহ তুলে ধরা হলো:

প্রচুর পরিমাণ পানি পান করাঃ ইউরিন ইনফেকশন হলে অবশ্যই পানি পান করার বিষয় খুব সচেতন থাকতে হবে। প্রস্রাবের রং হলুদ হলে দেরি না করে সাথে সাথে পানি খেতে হবে। স্বাভাবিক তিন থেকে চার ঘন্টা পর পর প্রস্রাব হওয়া উচিত। এর থেকে কম হলে বেশি পরিমাণ পানি খেতে হবে। কমপক্ষে দিনে তিন থেকে চার লিটার পানি খেতে হবে। এবং কোন সময় প্রস্রাবের চাপ দিলে আটকে রাখা যাবে না। বেশিক্ষণ প্রস্রাব আটকে রাখতে ইউরিন ইনফেকশন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। সবকিছু মেনে চললেই ইউরিন ইনফেকশন থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।

আনারস খাওয়াঃ আনারসের প্রচুর পরিমাণ ভিটামিন সি রয়েছে। ভিটামিন সি এর পাশাপাশি রয়েছে ব্রোমেলাইন নামক একটি উপকারী উৎসেচক। একটি গবেষণায় দেখা গিয়েছে ইউরিন ইনফেকশন রোগীদের কে ব্রোমেলাইন সমৃদ্ধ অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হয়। এজন্য আপনার যদি ইউরিন ইনফেকশন হয়ে থাকে তাহলে অবশ্যই দিনে একটি করে আনারস খাবেন না।

বেকিং সোডাঃ অনেক গবেষণায় দেখা গিয়েছে ব্রেকিং সোডা মূত্রনালির সংক্রামন দূর করতে সাহায্য করে। ইউরিন ইনফেকশন হয়ে থাকে মূত্রনালীতে। এই কারণে ব্রেকিং সোডা খেতে পারেন। ব্রেকিং সোডা খাওয়ার নিয়ম হচ্ছে, এক গ্লাস পানির সাথে আধা চামচ বেকিং সোডা মেশিয়ে নিন তারপরে পানি পান করুন। তবে খাওয়ার সময় অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে যেন যেন সোডার পরিমাণ বেশি না হয়। কারণ, ব্রেকিং সোডার পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া রয়েছে।

ভিটামিন সি গ্রহন করাঃ ইউরিন ইনফেকশন রোগীর খাদ্য তালিকায় অবশ্যই ভিটামিন সি রাখতে হবে। ভিটামিন সি প্রস্রাবের জ্বালাপোড়া কমায়। এছাড়াও ভিটামিন সি শরীরের ব্যাকটেরিয়া গুলোকে ধ্বংস করতে সাহায্য করে। ইউরিন ইনফেকশন এক ধরনের ব্যাকটেরিয়া এই কারণে অবশ্যই ভিটামিন সি খাবার বেশি খেতে হবে।

ক্র্যানবেরি জুসঃ ক্র্যানবেরি জুস UTI-এর জন্য একটি প্রাকৃতিক প্রতিকার হতে পারে। এটি ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণের বিরুদ্ধে কাজ করে এবং ইউরিনারি ট্র্যাক্টের স্বাস্থ্য উন্নত করে। তবে এটি যেকোনো সময় খাওয়া উচিত না, বিশেষ করে যদি আপনার ডায়াবেটিস থাকে।

হলুদঃ হলুদের মধ্যে রয়েছে অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি, অ্যান্টি-ব্যাকটেরিয়াল ও অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট গুণ। হলুদে থাকা কুরকুমিন উপাদান শরীরে ইনফেকশন কমাতে সহায়ক। গরম পানিতে ১/২ চামচ হলুদ মিশিয়ে পান করা যেতে পারে।

গরম পানি স্নানঃ গরম পানি স্নান (সিট্‌জ বাথ) ব্যথা কমাতে এবং স্নায়ুর উত্তেজনা শান্ত করতে সহায়ক হতে পারে। এটি প্রস্রাবের ইনফেকশনজনিত ব্যথা, জ্বালা ও চাপ কমাতে সাহায্য করে। আপনি একটি বেসিনে গরম পানি নিয়ে তাতে কিছুটা Epsom সল্ট মিশিয়ে স্নান করতে পারেন।

অ্যাপেল সিডার ভিনেগারঃ অ্যাপেল সিডার ভিনেগার প্রাকৃতিক অ্যান্টি-ব্যাকটেরিয়াল গুণসম্পন্ন। এটি প্রস্রাবের পিএইচ লেভেল ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করতে পারে। এক গ্লাস পানিতে ১-২ চামচ অ্যাপেল সিডার ভিনেগার মিশিয়ে পান করুন।

হাইজিন বজায় রাখাঃ টয়লেট ব্যবহার করার পর পরিষ্কার থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পিছন থেকে সামনে পরিষ্কার করা উচিত না, কারণ এতে ব্যাকটেরিয়া মূত্রথলিতে প্রবেশ করতে পারে। সব সময় পরিষ্কার পানি দিয়ে প্রস্রাবের পরে হালকা করে ধুয়ে নিতে হবে।

গর্ভাবস্থায় প্রস্রাবের রাস্তায় ব্যাথা হওয়ার কারণ

গর্ভাবস্থায় প্রস্রাবের রাস্তায় ব্যথা হওয়ার বিভিন্ন কারণ এবং এর উপসর্গগুলো কিছুটা ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু সাধারণত এটি শারীরিক পরিবর্তন এবং কিছু স্বাস্থ্যগত সমস্যার কারণে হয়ে থাকে। প্রধান কারণ হলো মূত্রনালীর সংক্রমণ (ইউটিআই)। গর্ভাবস্থায় ইউটিআই সাধারণ এবং প্রায় ২% থেকে ১০% গর্ভবতী মায়েদের প্রভাবিত করে। এই সংক্রমণগুলি মা ও ভ্রূণ উভয়ের স্বাস্থ্যের জন্য উল্লেখযোগ্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। নিচে বিস্তারিতভাবে এই কারণগুলো আলোচনা করা হলো।

১. গর্ভধারণের কারণে অঙ্গের পরিবর্তনঃ গর্ভাবস্থায়, বিশেষ করে দ্বিতীয় এবং তৃতীয় ত্রৈমাসিকের দিকে, শিশুর আকার বাড়ানোর ফলে গর্ভাশয় প্রসারিত হয় এবং এটি মূত্রাশয়ের উপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। এই চাপের কারণে মূত্রাশয় পূর্ণ হতে এবং প্রস্রাবের চাপ অনুভূত হতে পারে, যা ব্যথার কারণ হতে পারে। একইভাবে, প্রস্রাবের রাস্তা (ইউরেথ্রা) এবং মূত্রাশয়ের চারপাশের পেশীও চাপ অনুভব করতে পারে, এবং এই চাপের কারণে ব্যথা হতে পারে।

২. হরমোনাল পরিবর্তনঃ গর্ভাবস্থায় শরীরের মধ্যে প্রচুর হরমোন পরিবর্তন ঘটে। বিশেষ করে প্রোজেস্টেরন হরমোনের বৃদ্ধি মূত্রাশয়ের পেশীকে শিথিল করে, যার ফলে প্রস্রাবের রাস্তা এবং মূত্রাশয়ের চারপাশের পেশীগুলির টান কমে যেতে পারে। এই শিথিলতা বা টান কমে যাওয়ার কারণে মূত্রাশয়ে ব্যথা এবং অস্বস্তি হতে পারে।

৩. ইউরিন ট্র্যাক্ট ইনফেকশনঃ গর্ভাবস্থায় ইউরিন ট্র্যাক্ট ইনফেকশন (UTI) হওয়ার প্রবণতা বেড়ে যায়, কারণ গর্ভাবস্থায় শরীরে আরও বেশি পরিমাণে রক্ত প্রবাহিত হয় এবং মূত্রাশয়ের পেশীগুলি শিথিল হয়ে যায়, যা ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি এবং সংক্রমণের জন্য একটি সহায়ক পরিবেশ তৈরি করতে পারে। ইউটিআইয়ের কারণে প্রস্রাবের সময় ব্যথা, জ্বালাপোড়া, প্রস্রাবের পরিমাণ কম হওয়া, বা প্রস্রাবের সাথে রক্ত যাওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে।

ইউটিআই এর লক্ষণঃ

  • প্রস্রাবের সময় জ্বালাপোড়া বা ব্যথা
  • প্রস্রাব করার পরেও মূত্রাশয় খালি না হওয়ার অনুভূতি
  • প্রস্রাবে রক্ত বা পুঁজ
  • তলপেটে চাপ অনুভূতি বা ব্যথা
৪. মূত্রাশয়ের চাপঃ গর্ভাবস্থায় শিশুর বৃদ্ধি হওয়ার সাথে সাথে মূত্রাশয়ের উপর চাপ পড়ে। মূত্রাশয়ের চাপের কারণে প্রস্রাবের সময় অস্বস্তি বা ব্যথা হতে পারে, বিশেষত যখন মূত্রাশয় পূর্ণ থাকে বা প্রয়োজনের চেয়ে বেশি প্রস্রাব জমে যায়।

৫. প্রস্রাবের জন্য অতিরিক্ত চাহিদাঃ গর্ভাবস্থায় শরীর বেশি প্রস্রাবের জন্য চাপ দিতে থাকে, যার কারণে অনেক সময় প্রস্রাবের চাপ অত্যধিক অনুভূত হতে পারে। এই চাপের ফলে মূত্রাশয়ে ব্যথা হতে পারে। বিশেষ করে রাতে প্রস্রাবের জন্য ওঠার সময় এই ব্যথার অনুভূতি হতে পারে।

৬. গর্ভের অবস্থান এবং পেশী প্রসারণঃ গর্ভের আকার বাড়ার ফলে পেটের পেশীগুলি প্রসারিত হয় এবং একে অপরকে চাপ দিতে থাকে। এই চাপের ফলে পেশীগুলির মধ্যে টান সৃষ্টি হয় এবং এতে ব্যথা হতে পারে।

গর্ভাবস্থায় সাধারণত উপরের সব সমস্যা হয়ে থাকে। এই সমস্যাগুলোর কারণে প্রস্রাবের রাস্তায় ব্যথা অনুভব হয়। এই কারণে গর্ভাবস্থায় অনেক সাবধানতা অবলম্বন করতে হয়। গর্ভাবস্থায় ইউটিআই-এর কারণে পাইলোনেফ্রাইটিস (কিডনির সংক্রমণ) হতে পারে, যা উচ্চ জ্বর, ঠান্ডা লাগা, পিঠে ব্যথা এবং বমি হতে পারে। এছাড়া, ইউটিআই ভ্রূণের জন্য অকাল জন্ম, কম জন্মের ওজন এবং প্রসবকালীন মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

গর্ভাবস্থায় প্রস্রাব আটকে রাখলে কি হয়

গর্ভাবস্থায় প্রস্রাব আটকে রাখলে অনেক সমস্যার সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে ইউরিন ইনফেকশন হয়ে থাকে। এতে করে মা ও গর্ভের সন্তান দুজনেই স্বাস্থ্যগত ঝুকিতে পড়ে। প্রস্রাব আটকে রাখলে প্রস্রাবে থাকা ব্যাকটেরিয়া শরীরের সাথে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। যার ফলে খুব সহজেই অসুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এই কারণে, গর্ভাবস্থায় প্রস্রাব আটকে রাখা ঠিক না। এতে করে বড় ধরনের স্বার্থ ঝুকির সম্ভনা থাকে, যেমনঃ

মূত্রথলির উপর চাপঃ গর্ভাবস্থায় জরায়ু বাড়ে এবং এটি মূত্রথলির উপর চাপ সৃষ্টি করে। ফলে, মূত্রথলির ধারণক্ষমতা কমে যেতে পারে। প্রস্রাব আটকে রাখলে মূত্রথলি পূর্ণ হয়ে যায়, যা আরও চাপ সৃষ্টি করে এবং ব্যথার কারণ হতে পারে।

মূত্রনালী সংক্রমণঃ প্রস্রাব আটকে রাখলে মূত্রাশয়ে ব্যাকটেরিয়া বাড়তে পারে, যার ফলে মূত্রনালী সংক্রমণ হতে পারে। গর্ভাবস্থায় এটি মারাত্মক হতে পারে কারণ সংক্রমণ গর্ভাবস্থায় অন্যান্য জটিলতা তৈরি করতে পারে, যেমন preterm labor বা প্রি-টার্ম জন্ম।

কিডনি সমস্যাঃ যদি দীর্ঘ সময় ধরে প্রস্রাব আটকে রাখা হয়, তাহলে মূত্রাশয়ে প্রবাহ ঠিকভাবে না হওয়ায় কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। কিডনিতে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হওয়া এবং মূত্রাশয়ে সঠিকভাবে প্রস্রাব না যেতে পারা কিডনি সংক্রমণের দিকে নিয়ে যেতে পারে।

পেলভিক পেইনঃ গর্ভাবস্থায় জরায়ুর বৃদ্ধি, মূত্রাশয়ের সংকোচন, এবং শরীরের হরমোনাল পরিবর্তনগুলি প্রভাব ফেলতে পারে মূত্রাশয়ের কার্যক্ষমতার উপর। প্রস্রাব আটকে রাখলে এতে আরও বেশি চাপ সৃষ্টি হয়, যার ফলে পেটের নিচে বা পেলভিক অঞ্চলে ব্যথা হতে পারে।

অতিরিক্ত প্রস্রাবের চাপঃ দীর্ঘ সময় ধরে প্রস্রাব আটকে রাখলে মূত্রাশয় অতিরিক্ত ফুলে উঠতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে মূত্রাশয়ের পেশী দুর্বল হতে পারে এবং মূত্রত্যাগের সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে।

পরামর্শঃ

গর্ভাবস্থায় পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সেগুলি নিয়মিত এবং সঠিক সময়ে প্রস্রাব করার মাধ্যমে নিষ্কাশন করতে হবে। যদি প্রস্রাবের ক্ষেত্রে কোন সমস্যা বা ব্যথা অনুভব করেন, তাহলে ডাক্তারকে পরামর্শ দেওয়া উচিত।

গর্ভাবস্থায় ঘন ঘন প্রস্রাব হয় কেন

গর্ভাবস্থায় ঘন ঘন প্রস্রাব হওয়ার কারণ হলো হরমোনাল পরিবর্তন এবং গর্ভাশয়ের আকার বাড়ানোর জন্য শরীরের উপর বাড়তি চাপ পড়া। গর্ভাবস্থার প্রথম তিন মাসে শরীরে প্রোজেস্টেরন হরমোনের মাত্রা বেড়ে যায়, যা মূত্রাশয়ের পেশি শিথিল করে এবং প্রস্রাবের পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়। পরবর্তীতে গর্ভাশয় বড় হতে থাকে এবং এটি মূত্রাশয়ে চাপ সৃষ্টি করে, ফলে মূত্রাশয়ের ধারণক্ষমতা কমে যায়, যা ঘন ঘন প্রস্রাব করার অনুভূতি তৈরি করে।

এছাড়া, গর্ভাবস্থায় রক্তের পরিমাণও বেড়ে যায়, যা কিডনিকে আরও বেশি প্রস্রাব তৈরি করতে উত্সাহিত করে। এসব কারণে গর্ভাবস্থায় প্রস্রাবের পরিমাণ বেড়ে যায়। সাধারণত, গর্ভাবস্থার পরবর্তী সময়ে এই সমস্যা ধীরে ধীরে কমে যায়। গর্ভাবস্থায় ঘন ঘন প্রস্রাব হওয়া একটি সাধারণ সমস্যা, এবং এটি বেশিরভাগ গর্ভবতী মহিলাদের দেখা দেয়। গর্ভাবস্থায় ঘন ঘন প্রস্রাব হওয়ার কিছু মূল কারণ রয়েছে, যেমনঃ

১. হরমোনের পরিবর্তনঃ গর্ভাবস্থায় শরীরে প্রোজেস্টেরন এবং এইচসিজি (Human Chorionic Gonadotropin) হরমোনের পরিমাণ বেড়ে যায়। প্রোজেস্টেরন মূত্রাশয়ের পেশি শিথিল করে এবং মূত্রাশয়ের কার্যক্ষমতা কমাতে পারে। এই কারণে প্রস্রাবের পরিমাণ বাড়তে পারে এবং মূত্রাশয়ে আরও চাপ পড়ে।

২. গর্ভাশয়ের বৃদ্ধিঃ গর্ভাবস্থায় গর্ভাশয় বড় হতে থাকে এবং এটি মূত্রাশয়ের উপর চাপ সৃষ্টি করে। এর ফলে মূত্রাশয় ততটা ভালোভাবে প্রস্রাব ধারণ করতে পারে না এবং ছোট আয়তনের হওয়ার কারণে বেশি সময়ে প্রস্রাব বের হয়ে যায়। বিশেষ করে প্রথম তিন মাসে, গর্ভাশয় ছোট হলেও মূত্রাশয়ে চাপ পড়ে। তবে, দ্বিতীয় ত্রৈমাসিকের পর গর্ভাশয় আপাতত কিছুটা উপরের দিকে চলে যেতে পারে, ফলে কিছুটা উপশম হতে পারে।

৩. রক্তের পরিমাণ বৃদ্ধিঃ গর্ভাবস্থায় রক্তের পরিমাণ ৩০-৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়, যাতে মূত্র উৎপাদন বাড়ানোর জন্য কিডনিগুলির উপর চাপ পড়ে। এই চাপের ফলে কিডনিগুলি আরও বেশি প্রস্রাব তৈরি করে, যা ঘন ঘন প্রস্রাবের অনুভূতি সৃষ্টি করতে পারে।

৪. ব্র্যাকস্টন হিকস কনট্রাকশনঃ এটি গর্ভাবস্থায় একটি স্বাভাবিক উপসর্গ, যা "ভুয়া প্রসব যন্ত্রণা" নামে পরিচিত। এর ফলে গর্ভাশয়ের কিছু সংকোচন ঘটে, যা মূত্রাশয়ের উপর চাপ সৃষ্টি করে এবং প্রস্রাবের পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়।

৫. গর্ভাবস্থায় পানির চাহিদা বেড়ে যাওয়াঃ গর্ভাবস্থায় শরীরের পানির চাহিদা বাড়ে, কারণ আপনি এবং আপনার গর্ভস্থ শিশুর জন্য আরও পানি প্রয়োজন। পর্যাপ্ত পানি পান করলে প্রস্রাবের পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।

৬. গর্ভাবস্থায় শরীরের অন্যান্য পরিবর্তনঃ গর্ভাবস্থায় বিভিন্ন শারীরিক পরিবর্তন ঘটে যা শরীরের অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গের উপর প্রভাব ফেলতে পারে। যেমন, আপনার পেটের চাপ বৃদ্ধি পাওয়ায় হজমের প্রক্রিয়া কিছুটা ধীর হয়ে যেতে পারে এবং মূত্রাশয়ের উপর চাপ পড়তে পারে।

সমস্যা কমানোর উপায়ঃ

  • পানি পর্যাপ্ত পরিমাণে পান করুন, কিন্তু রাতে অতিরিক্ত পানি পান থেকে বিরত থাকুন যাতে রাতে ঘুমানোর সময় কম প্রস্রাব যেতে হয়।
  • নিয়মিত এবং স্বাভাবিকভাবে প্রস্রাব করুন। ঘরোয়া কাজ বা কাজের সময় একটানা বেশিক্ষণ প্রস্রাব আটকানো উচিত নয়, কারণ এটি মূত্রাশয়ে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
  • অতিরিক্ত ক্যাফেইন এবং মিষ্টি পানীয় এড়িয়ে চলুন, কারণ এগুলি মূত্রাশয়ে আরও চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

শেষ কথাঃ গর্ভাবস্থায় প্রস্রাবে ইনফেকশনের লক্ষণ ও প্রতিকার

গর্ভাবস্থায় মেয়েদের নানা ধরনের সমস্যা হয়ে থাকে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে প্রস্রাবে ইনফেকশন। গর্ভাবস্থায় প্রস্রাবে ইনফেকশন ঘটে যখন ব্যাকটেরিয়া মূত্রনালীতে প্রবেশ করে এবং মূত্রাশয়ে সংখ্যাবৃদ্ধি করে। এটি ঘন ঘন প্রস্রাব, প্রস্রাব করার সময় জ্বলন্ত সংবেদন এবং ঘোলা বা তীব্র গন্ধযুক্ত প্রস্রাবের মতো লক্ষণগুলির কারণ হতে পারে। গুরুতর ক্ষেত্রে, মূত্রাশয় সংক্রমণ কিডনি সংক্রমণ হতে পারে, যা আরও গুরুতর হতে পারে।

এর পাশাপাশি গর্ভের শিশুর স্বাস্থ্য ঝুকি হয়। এই কারণে গর্ভাবস্থায় বিভিন্ন সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন। বর্তমান সময়ে ইউরিন ইনফেকশন খুবই পরিচিত একটি রোগ। নারী বা পুরুষ উভয়ই এই রোগে আক্রান্ত হতে পারেন। সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসা নিলে ও কিছু নিয়মকানুন মেনে চললে এই রোগ থেকে সহজেই নিরাময় পাওয়া সম্ভব। গর্ভাবস্থায় প্রস্রাবে ইনফেকশনের লক্ষণ ও প্রতিকার সম্পর্কে সকলের জেনে রাখা প্রয়োজন।

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

বিডি টেকল্যান্ডের নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটা কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url